Home / বই আলোচনা / দম্পতিকথা : উত্তরাধুনিক পাঠ – আতিকুল বাসার

দম্পতিকথা : উত্তরাধুনিক পাঠ – আতিকুল বাসার

biibদম্পতিকথা : উত্তরাধুনিক পাঠ – আতিকুল বাসার

গল্পগ্রন্থ : দম্পতিকথা
গল্পকার : তাশরিক-ই-হাবিব
প্রকাশক : মিজান পাবলিশার্স
প্রকাশকাল : প্রথম সংস্করণ, অমর একুশে বইমেলা ২০১৬
মূল্য : ২০০ টাকা
প্রচ্ছদ : ফারহানা ফেরদৌসী

তাশরিক-ই-হাবিব নিঃসন্দেহে প্রথাবিরোধী গল্পকার। প্রথম গল্পগ্রন্থ ভরদুপুরে ও অন্যান্য গল্প-এর মাধ্যমে তিনি মননশীল পাঠকের কাছে ভিন্নভাবে গল্প বলার মতো পরিমিতিবোধের পরিচয় দিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় প্রচলিত গল্পধারায় কথার পর কথার মালা গেঁথে তোলার রীতিকে তিনি সচেতনভাবেভাবে পরিহার করেছেন দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ দম্পতিকথা-তে। অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৬ তে মিজান পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত একশ বারো পৃষ্ঠার বইটিতে গল্পের সংখ্যা পাঁচটি। তবু, চটজলদি বসে দ্রুত পড়ে ওঠার মতো বই এটি নয়। ফলে, আমজনতার অন্তর্গত গল্পপাঠকেরা এ বই পড়ে বিনোদিত হবেন না। কেননা, বইয়ের ফ্ল্যাপেই সতর্কবার্তা ঘোষিত, গল্পকার জনপ্রিয়তাকে উপেক্ষা করে নিরীক্ষার পথে এগিয়ে যেতে চান। আমরা তাঁর এ বক্তব্যকে নির্দ্বিধায় মেনে নেব না। বরং উত্তরাধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে গল্পবয়ানে তাঁর প্রচেষ্টা গল্পপাঠকের ভাবনায় স্বকীয় আবেদন সঞ্চার করতে সমর্থ কিনা, যাচাই করব।
গ্রন্থভুক্ত গল্পগুলোর প্রতিপাদ্য সম্পর্কে বলা যায়, সাংসারিক পরিমণ্ডলে নর-নারীর প্রতিদিনের যাপিত জীবনের চালচিত্রকেই তিনি এসব গল্পের আধার হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু এখানেই রয়েছে দৃষ্টিভঙ্গিগত স্বাতন্ত্র্যের পরিচয়। কেননা, একেক গল্পে গল্পবয়ানের কৌশল একেকরকম। এর আগে সংক্ষেপে বলে নেয়া যাক বইটির নামকরণ সম্পর্কিত কূটাভাষ প্রসঙ্গ। এর প্রচ্ছদে ব্যবহৃত হয়েছে রাধা-কৃষ্ণের প্রণয়চিত্র। ফলে যে কোনো পাঠক গল্পগুলো পড়ার আগেই এ ছবি দেখে ধাক্কা খাবেন। কারণ, রাধা-কৃষ্ণ তো দম্পতি নয়, তারা তো বাঙালি সমাজে প্রেমিক-প্রেমিকার চিরায়ত আদর্শের প্রতীক! তাহলে এ ধরনের বৈপরীত্যের কারণ কি? সম্ভবত, ব্যাপারটিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনার সুযোগ গল্পকার নিয়েছেন। সেটি হল, রাধা-কৃষ্ণ প্রেমিক-প্রেমিকা হলেও তাদের প্রণয়কাহিনী বাংলা সাহিত্যে যেভাবে রূপায়িত হয়েছে, এর অবলম্বন অবশ্যই গার্হস্থ্য পরিমণ্ডল। রাধা-কৃষ্ণের প্রণয়লীলার শেষ আকুতি তো পরস্পরের প্রতি একাত্মতা, যার সামাজিক স্বীকৃতি শুধু বিবাহোত্তর দাম্পত্য সম্পর্কেই সম্ভব! কাজেই মান্য অথচ একপেশে-গতানুগতিক ভাবনাকে উল্টে দিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার বা মানে বের করার এ প্রচেষ্টাকে উত্তরাধুনিকতার লক্ষণ বলে বিবেচনা করা চলে, বৈকি! যা হোক, গল্পকারের গল্প বলার দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে হলে প্রথমেই যাচাই করতে হবে গল্পগুলোর গল্পকথকদের ভূমিকা। ‘বাধা’ ও ‘ছেদ’ সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণ থেকে লিখিত। ‘গোপন কোনো ফুলের কথা’-য় প্রযুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি একেবারেই নতুন, যা এর আগে অন্য কোনো গল্প-উপন্যাসে দেখা যায়নি। নিঃসন্দেহে, এটি গল্পকারের নিজস্ব উদ্ভাবন। এখানে দুই প্রধান চরিত্র তথা নামহীন স্বামী-স্ত্রী উভয়েই চক্রাকারে উত্তম পুরুষ হিসেবে গল্পকথকের ভূমিকা পালন করেছে। একটি অনুচ্ছেদে স্বামী, পরেরটিতে স্ত্রী, এভাবে ঘুরে ঘুরে চক্রাবর্তন স্মৃতিতে তাদের আট বছরের দাম্পত্যজীবন বিবৃত। এ কৌশল পাঠকের ভাবনায় জাগায় চমক, উৎকণ্ঠা এবং প্রতিনিয়তই ঘটনাস্রোতের সঙ্গে নিজেকে তাল মিলিয়ে চলার সতর্ক মানসিকতা। কেননা, চিরাচরিত রীতিতে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতমুখী অগ্রসরতার ভঙ্গিকে উপেক্ষা করে এসব গল্পে আকস্মিক উল্লম্ফন, নানা চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে কাহিনীকে পল্লবিত করার ধরনে যুক্ত হয় ফ্ল্যাশব্যাক ও ফ্ল্যাশ ফরোয়ার্ড। এভাবেই পরিচিত রীতির সঙ্গে নতুন ভঙ্গিমার যোগসাজশে রচিত হতে থাকে গল্পটির আখ্যান অংশ। দুই গল্পকথকের দৃষ্টিভঙ্গির সুষ্ঠু সমন্বয় ঘটলে তবেই এ দম্পতির সাংসারিক জীবনের রূপরেখা অনুধাবন করা যায়। ‘হিমরাতের গল্প’ সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণ থেকে রচিত হলেও এতে কৌশলে লুকিয়ে রাখা হয়েছে উত্তম পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি। দুই অনুচ্ছেদবিশিষ্ট এ গল্পের প্রথমটিতে রুনার প্রাত্যহিক কর্মব্যস্ততার সমান্তরালে তার অতীত বৃত্তান্ত স্মৃতির পাতা উল্টে যেভাবে ভাষ্যরূপ পায় তার অন্তর্বাস্তবতাকে উন্মোচনে, তা প্রকাশের ক্ষেত্রে গল্পকার ‘আমি’ বা রুনার আত্মকথনকেই একটু ভিন্ন চালে হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেন। একই ব্যাপার অঞ্জনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তবে এ গল্পসংকলনে দৃষ্টিভঙ্গিগত জটিলতা জটিলতর রূপ পেয়েছে ‘ভাঙা আয়নার কোলাজ’ গল্পে। পাঁচ অনুচ্ছেদের এ গল্পের শুরুতে রয়েছে সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণ, এরপর প্রায় উনিশ পৃষ্ঠা জুড়ে গড়ে ওঠা দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে রয়েছে নামহীন উত্তমপুরুষ ‘আমি’-র প্রেক্ষণবিন্দু। এর সঙ্গে অন্য অনুচ্ছেদগুলোর যোগসাজস আপাতবিচ্ছিন্ন মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা নয়। তৃতীয় অনুচ্ছেদে রয়েছে একটি সংবাদ প্রতিবেদন। ধরা যায়, এটি সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণ থেকে বিবৃত। চতুর্থ পরিচ্ছেদে এর বিস্তার ঘটেছে। পঞ্চম বা শেষ অনুচ্ছেদে রয়েছে ফেসবুকে প্রচারিত রির্পোটের অনুষঙ্গ, যার সঙ্গে সংযোগ রয়েছে একমাত্র দ্বিতীয় বাদে অন্য অনুচ্ছেদগুলোর। কেন গল্পকার বিভিন্ন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিকে একটি গল্পে প্রয়োগ করেছেন? উত্তরাধুনিক ভাবনায় একজনের একক বা কেন্দ্রীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে অগ্রাহ্য করা হয়। কেননা, শক্তিশালী একজন যা বলে, অন্যদের তা মেনে নেয়ার বাধ্যবাধকতাকে উত্তরাধুনিকতা অস্বীকার করতে চায়। সেখানে যুক্ত হয় একেকজনের একেকভাবে দেখার অভিজ্ঞতা, যেগুলোর যোগসাজশে গড়ে ওঠে কোলাজ বা বিক্ষিপ্ত-ভাঙা টুকরোগুলোর সমাহার। এই যে নানা ভঙ্গি থেকে কর্পোরেট সমাজের আগাপাশতলাকে ছেঁকে তোলার প্রচেষ্টা, তা গল্পকারের চ্যালেঞ্জ গ্রহণের মানসিকতাকেই ধারণ করে।
এ বইয়ের গল্পগুলোতে কাহিনী বা প্লটকে একপ্রকার অস্বীকারই করা হয়েছে। কাহিনী নয়, বরং প্রতিটি গল্পের উপজীব্য দম্পতিদের জীবনে ঘটে চলা কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের আবেগ, সংবেদনা, অনুভূতিকেই বিভিন্ন দৃশ্যকল্পের আদলে বাক্সময় রূপ পেয়েছে। আর ঠিক একারণেই এসব গল্প প্রায়শই সংলাপহীন। সংলাপের উপযোগিতা যদিও ব্যক্তির মনের ভাব, আবেগ প্রকাশের তাগিদে, তবু এসব গল্পে বিষয়টিকে গতানুগতিকভাবে ভাবা হয়নি। সেকারণেই একটি ঘটনার সঙ্গে অন্য ঘটনা জুড়ে এযুগের কর্মক্লান্ত, বিতৃষ্ণ, নিঃসঙ্গ নর-নারীদের যে আদল গল্পকার গড়ে তোলেন তাতে চিন্তা ও মনস্তত্ত্বের ভূমিকা যতটা মুখ্য, তাদের পারস্পরিক সংলাপ বিনিময়ের প্রয়োজন ততটাই গৌণ। একারণেই স্বগতোক্তি, স্মৃতিচারিতা, স্বপ্ন, ফ্যানটাসির উপস্থিতি এত প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে গল্পগুলোতে। এদের কোনো নির্দিষ্ট অবয়বও সেকারণে গড়ে ওঠেনি। এসব বৈশিষ্ট্য উত্তরাধুনিক ছোটগল্পের লক্ষণাক্রান্ত। সুখপাঠ্য আখ্যানের পল্লবিত বিন্যাসের পরিবর্তে এবড়োখেবড়ো, এলোমেলো, উল্লম্ফনধর্মী বিবরণের যথেচ্ছ সমাহার ঘটিয়ে পাঠকের কেন্দ্রীভূত মনোযোগকে ছিন্নভিন্ন করার খেলায় গল্পকার যতদূর সম্ভব সচেষ্ট। বোঝা যায়, পরিশ্রমী পাঠকরাই শুধু তার গল্পের অনুধ্যানী হোক, এ ধরনের অভিলাষকে তিনি সংগোপনে ধারণ করেন। খণ্ড-ভগ্নাংশ ও বক্ররৈখিক কালপরিক্রমার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাঠগ্রহণে অনভ্যস্ত পাঠকের কাছে এসব গল্প একরাশ বিরক্তি উদ্রেক করবে, সন্দেহ নেই। ঘটতে থাকা বর্তমান সময়ের পরিসর ‘বাধা’ গল্পে মাত্র দুই-তিন ঘণ্টা, তারপর কেটে যায় আরো দুই দিন এবং এর মধ্যে টুকরো টুকরো বর্ণনায় জমতে থাকে অজস্র মুহূর্তের স্মৃতিচারী কোলাজ। ‘হিমরাতের গল্প’-এর পরিসর মাঝরাত থেকে ভোর। এ কয়েক ঘণ্টার চলমানতার মধ্যে কখন যেন ভিড় করে রুনা আর অঞ্জনের সকাল থেকে মধ্যরাতের, তার আগের দিনের এমনকি কৈশোরবেলার নানা ঘটনা, সংলাপ, স্মৃতি আর সম্পর্কের ছায়ামূর্তি। ‘ছেদ’ গল্পের সময় সাদা চোখে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত অতিবাহিত হলেও দীপার মনোলাকে তা যেন জমাটবদ্ধ রূপ পায় পরাবাস্তব নানা কল্পনায়। সেখানে সময়ের কাটার চলমানতা টিক টিক করে নাচে না, পাঠককে থামিয়ে রাখতে চায়, ভুলিয়ে দিতে চায় তার বাস্তবজীবনের শত কর্মব্যস্ততার প্রতি খেয়াল।
উত্তরাধুনিক কালপর্বের মানুষ শুধু নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। যদিও সংসারের গণ্ডিতে পরিবারকে আঁকড়ে ধরে সে সুখী হতে চায় বৈবাহিক জীবনে, কিন্তু এর অন্তরালে রয়েছে অভিনয়, ভান, শঠতা, ছদ্মবেশ আর মেকি জীবনভাবনার উপস্থিতি। প্রযুক্তির যথেচ্ছ অগ্রসরতার সুযোগ নিতে গিয়ে কর্মব্যস্ত মানুষেরা বিনোদনের ছলে যেভাবে নিজেকে নানাভাবে অবরুদ্ধ করে, এর পরিণতি আত্মবিবরগামিতা, সম্ভাবনার অকারণ অপচয়, বিকৃতি, স্খলন আর শাশ্বত মানবিক মূল্যবোধের পচন। ফলে আস্থা, বিশ্বাস ও আন্তরিকতা তিরোহিত হয়ে পারস্পরিক সম্পর্কে সৃষ্টি হয় অবক্ষয়ী অভিঘাত। বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি ও নাগরিকায়নের প্রভাব মানুষকে যে ভার্চুয়াল জগতের অতিবাস্তব ঘেরাটোপে বন্দি করে, তা তার খেয়ালে থাকে না। ফলে প্রাত্যহিক কর্মব্যস্ততার গণ্ডি থেকে ক্ষণিকের স্বস্তি পেতে সে শরণাপন্ন হয় ইন্টারনেটের। এভাবেই মায়াবী, প্রতারক, কৃত্রিম জগতের কুহকী ফাঁদে আটকে যায় মানবিক সম্পর্কগুলো। যখন এর সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের উন্মদনা আর সঙ্গীর প্রতি সংশয়ী মনোভঙ্গি, এর পরিণতিতে তাদের অন্তর্লোকে অনিকেতচেতনার স্ফুরণ অনিবার্যভাবে ঘটে যায়। এর ছাপ পড়ে ব্যক্তিমানুষের সংলাপে, আচরণে, অন্যের সঙ্গে ওঠাবসায়, সর্বোপরি সংসারজীবনে। এসব প্রসঙ্গ এ বইয়ের প্রতিটি গল্পেই রূপায়িত। এক্ষেত্রে গল্পকার সুকৌশলে ব্যবহার করেছেন গতিময় অথচ তির্যক, আপাতসরল অথচ বহুদূর সম্প্রসারিত গূঢ়ার্থমূলক ভাষাভঙ্গিকে। এর চেহারা আপাতদৃষ্টিতে শান্ত, শোভন, মনোহর; অথচ এর মাধ্যমে প্রকাশিত হয় পরিহাস, বিদ্রুপ, ঠাট্টা ও তীক্ষ্ম ইঙ্গিতরাশি। একধরনের আপাত অসংলগ্নতা, ভাঁড়ামি, প্রহেলিকাময় আচরণ ও উদ্ভট কর্মকাণ্ড, চিন্তাভাবনা গল্পগুলোর একাধিক চরিত্রের মনোবিকৃতিকে ফুটিয়ে তোলে। ‘ছেদ’ গল্পে প্রায় তিন পৃষ্ঠা জুড়ে পরাবাস্তবতাকে যৌনাশ্রয়ী অভিব্যক্তির মাধ্যমে রূপায়ণের অন্তরালে লুকিয়ে আছে দীপার দ্বিধাগ্রস্ত, আত্মকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। শরীরী সুখের আবেশ সমাজ ও ধর্মীয় অনুশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে বহুগামী সম্পর্কের সূত্রে তাকে যথেচ্ছ কাল্পনিক বিচরণে উদ্ধুদ্ধ করে। অন্যদিকে তার স্বামী নয়ন যখন পাশের রুমে স্ত্রীর উপস্থিতিকে উপেক্ষা করে ল্যাপটপে পর্নোগ্রাফি দেখে হস্তমৈথুনে মত্ত হয়, তখন বোঝা যায়, দাম্পত্য সম্পর্কের বয়ানে লেখক আবেগহীন, নির্লিপ্ত। আশ্চর্য লাগে এই ভেবে, এমনও হতে পারে আজকের ঢাকার শিক্ষিত নাগরিক মধ্যবিত্তের অন্তর্গত দম্পতির জীবনচিত্র! স্বাভাবিকভাবেই এসব বিষয় ভাষ্যরূপ পেয়েছে বিশেষ ধরনের শব্দরাশি, বাগধারা ও দেহভঙ্গিমাযোগে, যা প্রত্যাখ্যান করে তথাকথিত নাগরিক ভদ্রতা ও শিষ্ট মূল্যবোধকে। পাশাপাশি হৈ-হুল্লোড়, খিস্তি-খেউড়, অশ্লীল ও নোংরা শব্দরাশি অবলীলায় সংযুক্ত হয় ‘ভাঙা আয়নার কোলাজ’ গল্পের উত্তম পুরুষের স্বগতোক্তিতে। ‘বাড়া’, ‘ধোন’ ‘খাউজানি’, ‘খানকি’, ‘চুদানি’ এসব শব্দ অবশ্যই উত্তরাধুনিক শব্দরাশির অন্তর্গত, যা ধারালো চাবুকের মত ক্রমাগত চাবকায় নাগরিক মানুষের মার্জিত অভিব্যক্তিকে, হয়ে ওঠে তার অবচেতনলোকে পুঞ্জীভূত ক্রোধ ও জিঘাংসা উন্মোচনের ভাষিক হাতিয়ার।
প্রথাগত প্রারম্ভ ও পরিসমাপ্তি এসব গল্পে অনুপস্থিত। শুরুতেই পাঠককে কোনো কাহিনীর আভাস দিয়ে গল্পভুবনে পরিভ্রমণের আহ্বান সেকারণেই নেই। বরং অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে হঠাৎ ঢুকে চারপাশের অন্ধকারে খাবি খেতে খেতে চোখের সামনে চলমান রূপালি পর্দায় প্রতিফলিত আলোর বিচ্ছুরণকে ধীরে ধীরে সয়ে ওঠার মত করেই এসব গল্প পড়তে হয়। আলাপচারিতার উপযোগী সহজাত গদ্যের সম্মোহনে গল্পকার পাঠককে গল্পের ভুবনে টেনে আনেন। এরপর তিনি তাকে সুযোগ করে দেন নিজের মত করে গল্পের উপজীব্য বা পরিণতি বা কোনো ঘটনার কার্যকারণ বা কোনো দৃশ্যের প্রাসঙ্গিকতার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা ব্যঞ্জনা বা বিশেষ কোনো ইঙ্গিত বুঝে নিতে। গল্পকার এমন খেলায় পাঠককে উদ্বুদ্ধ করেন, যেখানে রয়েছে শিহরণ, চমক, জিজ্ঞাসা আর কৌতূহল। একনাগাড়ে সব কিছু গড়গড় করে বলে দিতে তিনি অনাগ্রহী। ঘটনার বাঁকবদল ঘটিয়ে কখনো পাঠককে থামিয়ে দিয়ে, কখনো একটি পরিস্থিতিতে বিপরীতধর্মী একাধিক দৃশ্যের সমাবেশ ঘটিয়ে, কখনো বা কোনো প্রসঙ্গে আলাপ শুরু করেও দীর্ঘক্ষণ সেটি থেকে পাঠকের মনোযোগ দূরে রাখার কৌশলকেও তিনি নির্দ্বিধায় গ্রহণ করেন। এর ফলে এসব গল্পের প্রারম্ভ ও পরিসমাপ্তি আখ্যানভাগের অন্তর্গত ঘটনারাশির পরিণতি সংক্রান্ত একাধিক সম্ভাবনা, জিজ্ঞাসা আর সন্দেহজনক পরিস্থিতিকে জিইয়ে রাখে। এতে পাঠকের ওপর যে চাপ সৃষ্টি হয়, এরই পরম্পরায় সে পুনরায় সেই গল্প বা গল্পগুলো পড়ে নিজের মত করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এসব গল্পে সবকিছুই বলে দেয়া হয় না, সব প্রশ্নের যথাযথ উত্তরও মেলে না। পাঠককে স্বাধীনভাবে ভাবার সুযোগ দিতে গল্পকার যেন হাসিমুখেই প্রস্তুত রয়েছেন। এসব গল্প একাধিকবার না পড়ে পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য অনুধাবন পাঠকের জন্য দুষ্কর। কেননা, পাতার পর পাতায় অনুচ্ছেদহীন একটানা বিবরণের যেখানে সেখানে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে থাকে নানা তথ্য, গল্পকারের ব্যক্তিজীবনের প্রগাঢ় অভিজ্ঞতার নির্যাস আর কুশীলবদের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিবেশের অজস্র ইশারা, সংকেত। ফলে হুট করে পাঠ থামিয়ে দিলে পাঠককে পুনরায় গল্পের পাঠযাত্রা শুরু করতে হয়। গতিময়, স্বতঃস্ফূর্ত গদ্যভঙ্গির কারণে গল্পগুলোর একটানা পাঠেও যে ক্লান্তির ছাপ পড়ে না পাঠকের মনে, এটি অত্যন্ত বিস্ময়কর ব্যাপার।
নিত্যদিনের যাপিত জীবনে পারিপার্শ্বিক বাস্তবতার অভিঘাত গল্পগুলোর কুশীলবদের অন্তর্লোকে যে চাপ, দ্বিধা ও উদ্বেগের অতল গহ্বর গড়ে তোলে, এর রূপায়ণে পরাবাস্তব, জাদুবাস্তব আর অতিবাস্তবের উপস্থিতিও স্মরণ করিয়ে দেয় উত্তরাধুনিক আখ্যানবিন্যাসের চারিত্র্যকে। যে বাস্তবতাকে প্রতিমুহূর্তেই পীড়াদায়ক মনে হয়, যার অলঙ্ঘনীয় চাপ মানুষগুলোকে চিন্তা-চেতনায় ক্রমাগত নিঃসঙ্গ, অসহায় ও জীবনবিমুখ করে তোলে, তা রূপায়ণে গল্পকার সঙ্গত কারণেই এসব কৌশলের দ্বারস্থ হন। অতিবাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে পীড়ন, অন্তর্গত সংকট, অন্যদের সঙ্গে তো বটেই, এমনকি নিজের সঙ্গেও প্রতিমুহূর্তে সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার মত ঝুঁকিপূর্ণ-আক্রমণাত্মক অভিব্যক্তি, অনিশ্চয়তা, পরিস্থিতিবিশেষে নিরাসক্তি প্রভৃতি; যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে তার সংলাপে, ব্যবহারে, অন্যের নিকট নিজেকে উপস্থাপনে। ‘ভাঙা আয়নার কোলাজ’ গল্পের উত্তমপুরুষ এর প্রতিনিধি। অন্যদিকে ‘হিমরাতের গল্প’-তে মাঝরাতে হলের ডিউটি পালন করতে গিয়ে রুনার ধর্ষিত হবার আশঙ্কার সমান্তরালে দেয়ালে বসা প্রজাপতিকে পেটমোটা টিকটিকির শিকারে পরিণত হওয়ার ঘটনাকে আপাতঅর্থে রূপক বলা গেলেও একই ধরনের ঘটনা গল্পের শেষভাগে যখন অঞ্জনের দৃষ্টিকোণ থেকেও উপস্থাপিত হয় এবং পরাবাস্তবের আশ্রয়ে রুনার মৃতদেহকে তার কল্পনায় ফুটিয়ে তোলা হয়, তখন সেই রূপকই জাদুবাস্তবতার আধারে গল্পের অনুচ্চারিত বক্তব্যকে বাক্সময় করে তোলে। ‘বাধা’ গল্পের শুরুতে যে শিশুকে মিতা ‘বাবাসোনা’ সুলভ ভালোবাসার সম্ভাষণে অভিষিক্ত করে, গল্পের পরিণতিতে তারই জন্য মিতা ও মুনশাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়। এই যে মমতার বন্ধন আর সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের দায়বদ্ধতা, এর নেপথ্যে কি এ দম্পতির পরস্পরের প্রতি অশেষ বিরক্তি আর দিন দিন ভাঁপিয়ে ওঠা জীবনের প্রতি ভয়াবহ বিমুখতা নেই! তবে তারা কেন পলায়নপর মনোবৃত্তি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হয় আত্মহত্যার প্ররোচনায়? এ কি নিছক বাস্তব, নাকি অতিবাস্তবেরই শিল্পভাষ্য!
কোনো বিশেষ তত্ত্ব অবলম্বনে বহমান মানবজীবনের ভাষ্যনির্মাণের প্রচেষ্টা নিছক কৃত্রিম নয়, বরং শিল্পের প্রতি বিমুখতার সাক্ষ্যবহও বটে। কিন্তু এ কথা দম্পতিকথার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কেননা, এর গল্পগুলোতে প্রতিপাদ্য মানবসম্পর্কের রূপায়ণে গল্পকার কোনো আরোপিত ভাবনা, তত্ত্ব বা দর্শনকে অনুপ্রবিষ্ট করেননি। বরং তাঁর কব্জির জোরে উত্তরাধুনিক সাহিত্যভাবনা সংশ্লিষ্ট প্রসঙ্গগুলো নতুন ভঙ্গিতে বিশেষ দেহকাঠামোকে আশ্রয় করে গল্পগুলোকে বাক্সময় করে তুলেছে সমকালীন ঢাকার নাগরিকসমাজের পটভূমিতে। এখানেই তাশরিক-ই-হাবিবের কৃতিত্ব। এটি যে সবে তাঁর দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ, গল্পগুলো পড়ে তা বোঝার সাধ্য পাঠকের নেই। যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে ঝুঁকি গ্রহণের মানসিকতাকে আত্মস্থ করেই তিনি নিরীক্ষার পথে হেঁটে চলেছেন। বাংলাদেশের ছোটগল্পের ভুবনকে তিনি নতুন ফসলের আবাদভূমি করে তুলবেন, সেই সম্ভাবনার ভাষ্যরূপ এ গল্পগ্রন্থ।

গল্পগ্রন্থ : দম্পতিকথা
গল্পকার : তাশরিক-ই-হাবিব
প্রকাশক : মিজান পাবলিশার্স
প্রকাশকাল : প্রথম সংস্করণ, অমর একুশে বইমেলা ২০১৬
মূল্য : ২০০ টাকা
প্রচ্ছদ : ফারহানা ফেরদৌসী