Home / বই আলোচনা / ‘অমৃত অর্জন’ মুক্তিযুদ্ধের অমিমাংসিত অধ্যায়ের মৌলিক সৃজন ।। রেজা ঘটক

‘অমৃত অর্জন’ মুক্তিযুদ্ধের অমিমাংসিত অধ্যায়ের মৌলিক সৃজন ।। রেজা ঘটক

b1‘অমৃত অর্জন’ মুক্তিযুদ্ধের অমিমাংসিত অধ্যায়ের মৌলিক সৃজন ।। রেজা ঘটক

মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব ঘটনাকে প্রেক্ষিত করে এবার উপন্যাস লিখেছেন কথাসাহিত্যিক সোনালী ইসলাম। একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সুদীর্ঘ নয় মাসে সারা পূর্ববঙ্গের গ্রাম-শহর-অজপাড়াগাঁ-পাড়া-মহল্লা-সবত্র মানুষে মানুষে যে স্বার্থের বিভেদ-দ্বন্দ্ব-গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব-শ্রেণীভেদ, জাতিগত দৃষ্টিভঙ্গীর চরম কুটিল-কলহ ঘোট পাকিয়েছিল, তারই এক টাটকা অথচ নির্মেদ, সরল, বাস্তবানুগ উপাখ্যানকে ঘিরে এগিয়ে চলে সোনালী ইসলামের মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক উপন্যাস ‘অমৃত অর্জন’।

‘অমৃত অর্জন’ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বৃহত্তর যশোর জেলার এক নিভৃত পল্লী দেয়াপাড়া গ্রাম। গোটা বাংলাদেশের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়ে একাত্তরে পাক-হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় বাঙালি দোসর রাজাকার-আলবদর-আলশামস-শান্তিকমিটি নিরীহ সাধারণ মানুষের উপর যে নিশংসতা চালিয়েছিল, তারই খণ্ডচিত্রের এক জীবন্ত ইতিহাস যেন সোনালী ইসলামের মৌলিক উপন্যাস ‘অমৃত অর্জন’। ভৈরব নদীর তীরে দেয়াপাড়া গ্রামের তিন প্রভাবশালী পরিবার- সৈয়দ সাহেবের পরিবার, শামসু কাজী সাহেবের পরিবার আর মুক্তিযুদ্ধের সময় দেয়াপাড়া গ্রামে নিজ উদ্যোগে শান্তিকমিটি গঠন করে নিজেই সেই শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান সেজে বসা নব্য রাজাকার আজহার মীর পরিবারের একেবারের হাঁড়ির খবরকে ঘিরেই এগিয়ে যায় এই উপন্যাস।

সৈয়দ সাহেবের পরিবার দেয়াপাড়া গ্রামে সবচেয়ে অভিজাত ও প্রভাবশালী। সৈয়দ সাহেব ও তাঁর স্ত্রী বছরের বেশিরভাগ সময় যশোর শহরে নিজেদের বাড়িতে বসবাস করেন। বয়স্ক সৈয়দ সাহেব ও তাঁর স্ত্রী মাঝে মাঝে গ্রামের বাড়িতে এসে কিছুদিন অবকাশযাপন করেন। একমাত্র ছেলে মাজেদ ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে। দেয়াপাড়া গ্রামে সৈয়দ সাহেবের রয়েছে অঢেল সম্পত্তি, বাগানবাড়ি, কৃষিজমি, লিচুবাগান, জমিনদারি। দেয়াপাড়া গ্রামের সবাই সৈয়দ সাহেবকে খুবই সম্মান করেন। সেই সম্মান ও অভিজাত্য টিকিয়ে রাখতে তিনি গ্রামের গরীব-দুঃখীদের উদারহস্তে সহযোগিতা করেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সৈয়দ সাহেব আর তাঁর স্ত্রী যশোর থেকে গ্রামের বাড়িতে এসে বসবাস শুরু করেন। আর বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তাঁদের একমাত্র ছেলে মাজেদ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়।

দেয়াপাড়া গ্রামের দ্বিতীয় প্রভাবশালী পরিবার হলো শামসু কাজী সাহেবের পরিবার। শামসু কাজী ও তাঁর বুদ্ধিমতী স্ত্রী নাহার বানু’র এক ছেলে ও তিন মেয়ে। বড় দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। মেজে মেয়ে কুসুম পাঁচ মাসের পোয়াতি। কুসুমরা থাকে যশোর শহরে। ছোট মেয়ে ফুলি’র বিয়ের কথাবার্তা চলছে। ছেলে মোতালেব ও মোতালেবের স্ত্রী শরীফা’র একটি পুত্রসন্তান ছোট্ট শরিফুল। দেয়াপাড়া গ্রামের একমাত্র মসজিদটি শামসু কাজী’র বাবা নির্মাণ করেছেন। সেই মসজিদে গ্রামের সবাই শুক্রবারের জুমা’র নামাজ পড়েন। ব্যতিক্রম কেবল গ্রামের আরেক প্রভাবশালী মাতবর আজহার মীর।

প্রতিবেশী আজহার মীরের বড় ছেলে হামিদুলের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল শামসু কাজী’র মেজে মেয়ে কুসুমের। হামিদুল আর কুসুমের প্রেমের সম্পর্ককে ঘিরেই কাজী আর মীর পরিবারের পুরানা দ্বন্দ্ব মুক্তিযুদ্ধের সময় আবারো প্রাকাশ্যে রূপ নেয়। সেই ঘটনায় আজহার মীর শামসু কাজীকে অপমান করেন। হামিদুল আর কুসুমের প্রেমের সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত আর পরিণতিতে গড়ায়নি। সেই থেকে আজহার মীর আর শামসু কাজীদের মসজিদে জুমা’র নামাজ পড়তেও যায় না। বরং কুসুমের বিয়ে হয়ে যায় যশোরে আর হামিদুলকে জোর করে বিয়ে দেন বাবা আজহার মীর। হামিদুলের সেই জবরদস্তির সংসার অবশ্য আর টেকেনি। হামিদুলের স্ত্রী বাপের বাড়ি চলে গেছে। গ্রামে উড়ো খবর হলো মীর বাড়ি থেকে তারা মেয়ে ছাড়িয়ে নেবে। আজহার মীরের দুই ছেলে হামিদুল আর সাইদুল। হামিদুলের বিয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই বাবা আজহার মীরের সঙ্গে হামিদুলের অদৃশ্য সম্পর্ক দা-কুমড়োর। নিজের স্ত্রী বাপের বাড়ি চলে যাওয়ায় আর ওদিকে কুসুমের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর থেকেই হামিদুল অবশ্য অনেকটা বিবাগী জীবন বেছে নিয়েছে। ছোটভাই সাইদুলও গোপনে হামিদুলকে পছন্দ করে। হামিদুল-সাইদুল দুই ভাই বিশ্বাস করে গ্রামের সবচেয়ে খারাপ ও বাটপার মানুষটাই তাদের বাপ আজহার মীর। বাবার সঙ্গে ছেলেদের এই নিরব দ্বন্দ্বের মাসুল অবশ্য পোহাতে হয় হামিদুল-সাইদুলের মাকে। আজহার মীর নানান কিসিমের ছুতা পেলেই স্ত্রী’র গায়ে হাত তোলেন।

বউ পিটানো এই আজহার মীর শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের সেই সন্ধিক্ষণে চূড়ান্ত খারাপ হওয়ার সুযোগকেই লুফে নেয়। নিজেই তার সাঙ্গপাঙ্গ জমির, এখলাস, কলিমদের নিয়ে গ্রামের বেকার যুব্ক ছেলেদের সরকারি বেতনভাতা, সম্পত্তি পাবার লোভ, যৈবতী মেয়ের শরীরের লোভ দেখিয়ে আর খাস মুসলমান হবার সুযোগকে মওকা বানিয়ে ফুসলিয়ে রাজাকার-আলবদর-আলশামস গঠন করে। আর আজহার মীর নিজেই নিজেকে সেই শান্তিকমিটির চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন। নিজ উদ্যোগে যশোর ক্যান্টমেন্টে গিয়ে তিনি পাক-আর্মির কর্নেল সাহেবকে হাত করার চেষ্টা করেন। যুবকদের পাক-আর্মি দিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, অস্ত্র-গোলঅবারুদ পাবার উপায় বের করেন।
আজহার মীর কেবল শান্তিকমিটি গঠন করেই ক্ষ্যান্ত হন না, গ্রামে সবার মনে ভয় ঢুকিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য টার্গেট করেন দেয়াপাড়া গ্রামের সবচেয়ে নিরীহ এব সনাতন বৈষ্ণব দামোদর মাইতীকে। যাকে গ্রামের সবাই ডাকে দামু নামে। দামু’র চৌদ্দগুষ্ঠিতে আর কেউ নেই। বাপের ভিটায় দামু বসে বসে কেবল গান বাঁধে। মাছ-মাংস খায় না দামু। তবু সৈয়দ সাহেবের বাড়ি থেকে আর শামসু কাজী সাহেবের বাড়িতে তার এবেলা ওবেলা খাবার জোটে। কৃষিজমি যেটুকু ছিল বাবা মারা যাবার পর আজহার মীর সেটুকু দখল করেছেন। মা মারা যাবার পর এবার দামু’র বাড়িটা দখল করার পায়তারা করেন আজহার মীর গংরা। গোটা দেয়াপাড়া গ্রামে দামু’র এমনিতে কোনো শত্রু নাই। কারণ দামু’র কণ্ঠে একবার যে গান শোনে, সে নিরীহ এই বিবাগী দামুকে বরং পছন্দই করে। আজহার মীর তাই গ্রামে ত্রাসের রাজত্ব শুরু করে অন্যদের মনে ভয় ধরিয়ে দেবার জন্য প্রথমেই তার কাছারিতে ডেকে পাঠায় এই হিন্দু বৈষ্ণব দামোদর মাইতীকে। সোজা-সাপটা জানিয়ে দেয়, দেশে এখন যুদ্ধ চলছে। তুই তোর বাপের দেশ ভারতে চলে যা। আর যদি এখানে থাকতে চাস তো তোর মুসলমান হয়েই থাকতে হবে।

শামসু কাজী অবশ্য দামুকে এই ভয়ের জন্য আগেই হুশিয়ার করে বলেছিলেন, দামু তুই পারলে ভারতে পালিয়ে যা। দামু তখন এই ভয়ংকর আশংকা ঠাওর করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত দামু মুসলমান হয়েই বাপদাদার চৌদ্দ-পুরুষের ভিটায় মাটি কামড়ে থাকতে চেয়ছিল। সেই সুযোগে আজহার মীরের সাঙ্গপাঙ্গরা শুক্রবার জুমা’র আগেই দামুকে হাজির করে কাজীদের মসজিদে। জুমা’র পর আজহার মীরের নির্দেশে মসজিদের ইমাম সাহেব দামুকে কালিমা তৈয়াবা পড়িয়ে মুসলমান করেন। এরপর আজহার মীরের নির্দেশে দামু’র উপর যে নিশংসতা চালানো হয়, তা দেখে আর উপস্থিত সৈয়দ সাহেব ও শামসু কাজী সাহেব সেখানে থাকতে পারেননি। জমির, এখলাস ও কলিমরা ছুরি নিয়ে দামুকে জোরজবরদস্তি করে মোসলমানি দেয়। আর আর্তনাদরত দামু’র ছটফটানির ভেতরে তার গালে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় রান্না করা গরুর মাংস। ফলস্বরূপ সেই রাতে দামু’র প্রচণ্ড জ্বর আসে। কিন্তু আজহার মীরের ডানহাত বলে খ্যাত জমিরের পরামর্শে শেষরাতে দামু’র মুখে গামছা আর শরীরে ইট বেঁধে নিশংসভাবে ভৈরব নদীতে ডুবিয়ে মারা হয়।

আজহার মীরের এই নিশংসতা দেখে গ্রাম ছেড়ে যশোরে চলে যেতে বাধ্য হয় সৈয়দ সাহেব ও তাঁর স্ত্রী। কারণ আজহার মীর নিজে গিয়ে সৈয়দ সাহেবকে বলেন যে, আপনার ছেলেকে মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরিয়ে আনেন। সৈয়দ সাহেব যশোর চলে গেলে তার সম্পত্তি দখল করেন আজহার মীর, জমির, এখলাস, কলিম ও তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা। সৈয়দ সাহেব যশোর চলে যাওয়ায় একা হয়ে ভীষণ ভয় পেয়ে যান শামসু কাজী সাহেব। আজহার মীরদের তাণ্ডব থেকে ছেলেকে বাঁচাতে মোতালেবকে পাঠিয়ে দেন খালা শ্বশুড়ির বাড়িতে। আর স্ত্রী নাহার বানু’র পরামর্শে মোতালেবের স্ত্রী শরীফা, মেজে মেয়ে সন্তান পোয়াতি কুসুমের জায়গা হয় দুই ঘরের দুই কাঠের মাচায়। কিশোরী ফুলিকে লুকিয়ে রাখা হয় ধানের গোলার ভেতর। আর মোতালেবের ছোট্ট ছেলেকে নাহার বানু’র সিন্দুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা হয়। কেবল শামসু কাজী আর নাহার বানু বাড়িতে আছেন, আজহার মীরের লোকজনদের এমনটা বোঝাতেই নাহার বানু’র এই তরিকা। বাইরে রটিয়ে দেওয়া হয় যে, মোতালেব খালা শ্বাশুড়ির বাড়িতে গেছে, বৌমা শরীফা গেছে বাপের বাড়ি, আর কুসুম ফুলিকে সঙ্গে নিয়ে যশোর স্বামীর বাড়িতে গেছে।

শামসু কাজী সাহেবের বাড়ির চারদিকে পাহাড়া বসিয়ে রাখে আজহার মীরের লোকজন। বাড়িতে অন্য কাউকে না দেখে নাহার বানু’র রটিয়ে দেওয়া গুজব সবাই বিশ্বাস করতে থাকে। ওদিকে আহজার মীরের গোপন সন্দেহ এতচোখ ফাঁকি দিয়ে ওরা কীভাবে গেল! কাজী বাড়ি’র চারপাশে আরো কঠোর পাহারা বসানো হয়। পাহারাদাররা আজহার মীরকে জানায় যে শামসু কাজী’র পুকুরে বড় বড় মাছ আছে। আসলে রাতের আঁধারে শরীফা, কুসুম, ফুলিদের গোসলের শব্দকে ওরা বড় মাছ ঠাওর করে। রাতে সেই মাছ খুব শব্দ করে। চতুর আজহার মীর কাজী পরিবারের কৌশল বুঝতে পেরে নিজের লোকদের কাচারিতে ডেকে নির্দেশ দেয় রাতেই কাজী বাড়িতে কেরোসিন দিয়ে আগুন দেওয়ার জন্য। যদি মেয়েছেলেরা সত্যি সত্যি বাড়িতে থাকে তাহলে আগুন লাগলে তখন সবাই বের হয়ে আসবে। আর সেই সুযোগে শরীফা, কুসুম আর ফুলিকে তুলে দিয়ে পাক কর্নেল সাহেবকে খুশি করার ব্যবস্থা করবে আহার মীর। দখল করবে কাজীদের সকল সম্পত্তি।

আজহার মীরের সেই কৌশল চুপচাপ শোনে বড় ছেলে হামিদুল। হামিদুল কুসুমদের বাঁচানোর নানান উপায় খুঁজতে থাকে। অমন চতুর বাপকে ফাঁকি দিয়ে কুসুমদের বাঁচানোটা অতোটা সহজ কাজ নয়। তাই হামিদুল ছোট ভাই সাইদুলকে অনুরোধ করে যে করেই হোক চেঙগুটিয়ার মধু মাঝির বাড়িতে খবর দিতে হবে। তাহলে মুক্তিযোদ্ধা এসে কুসুমদের উদ্ধার করতে পারবে। সে অনুযায়ী কাকডাকা ভোরেই সাইদুল ছুটে যায় চেঙগুটিয়া। মধু মাঝি’র বাড়ি সে চেনে না। তবু সে উন্মাদের মত ছোপঝাড় ফেঁড়ে ছোটে। পথে এক মাঝ বয়সি মহিলা রক্তাক্ত সাইদুলকে দেখে থমকে যায়। সাইদুলের তখন পা দিয়ে রক্ত ঝড়ছিল। পরম মমতায় সেই মহিলা সাইদুলের সেবা করেন। নিজ উদ্যোগে মধু মাঝিকে খবর দেন। সে অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধারা মসজিদের আশেপাশে ও কাজী বাড়ির চারদিকে অবস্থান নেয়। জুমা’র নামাজ পড়তে যাবার জন্য আজহার মীর যখন রাস্তা দিয়ে যেতে থাকেন, তখনই গাছের আড়াল থেকে অতর্কিত হামলা চালায় মুক্তিযোদ্ধারা। ঘটনাস্থলেই গুলিতে প্রাণ হারায় আজহার মীর ও তার প্রধান সাগরেদ জমির।

রাজাকার বাবা’র মৃত্যুতে সবচেয়ে খুশি হয় পুত্র হামিদুল আর সাইদুল। তারা ‘জয় বাংলা’ বলে চেঁচিয়ে ওঠে। পরদিন স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। মুক্তির আনন্দে ঘরের বন্দিদশা থেকে বাইরে আসে শরীফা, কুসুম, ফুলিরা। দেশ স্বাধীনের পর কোনো এক সময় সৈয়দ সাহেবের ছেলে মাজেদের সঙ্গেই বিয়ে হয় ফুলি’র। এখানে উপন্যাস শেষ হয়।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় সারা বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জেও যেভাবে রাজাকার-আলবদর-আলশামস-শান্তিকমিটির লোকজন পাক-হানাদারদের সহযোগিতায় তাণ্ডব ও নিশংসতায় মেতে উঠেছিল, আর সেই জটিল সমীকরণ থেকে কীভাবে অত্যন্ত দুঃসাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করে নির্ভিক মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীনের পাশাপাশি মা-বোনদের ইজ্জত রক্ষা করেছিল, সোনালী ইসলামের উপন্যাসে সেই জটিল পটভূমি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সহজ, সরল, প্রাঞ্জল ভাষায় ফুটে উঠেছে। একাত্তরে আমাদের মা ও মাটির মুক্তির জন্য হানাদারদের হাজারো চোখরাঙানি, জবরদস্তি, দখল, খুন, রাহাজানি, নির্মমতা, বর্বরতাকে হারিয়ে, ত্রিশ লাখ শহীদ ও সাড়ে চার লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম হারানোর বিনিময়ে আমরা যে চূড়ান্ত স্বাধীনতা অর্জন করতে পেরেছিলাম, সেই নির্মম সত্যকেই যেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ভাষা শব্দের কৌশলী প্রয়োগে, কাহিনীর বাস্তবতায়, একাত্তরের ঘটনা পরম্পরায় প্রতীকি দেয়াপাড়া গ্রামটাই যেন এক টুকরো বাংলাদেশেরই প্রতিধ্বনি তোলে। আর যার চূড়ান্ত অর্জন বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

একাত্তরে গোটা বাংলাদেশের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়ে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির জীবনেই আলোচ্য উপন্যাসের দেয়াপাড়া গ্রামের মতই ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখী হয়েছিল। কথাশিল্পী সোনালী ইসলাম অত্যন্ত অল্পকথায়, একাত্তরের জটিল সেই সমীকরণকে পাঠকের সামনে অত্যন্ত দক্ষতার সাথেই সহজভাবেই হাজির করেছেন। উপন্যাসের কাজী পরিবার আর মীর পরিবারের চিরায়ত দ্বন্দ্ব যেন শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সুদীর্ঘ চব্বিশ বছরের স্বাধীতার আন্দোলন, অর্থনৈতিক মুক্তি ও শোষণের বিরুদ্ধে শোষিতদের লড়াইয়ের সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকেই চিত্রায়িত করেছে।

সোনালী ইসলামের ‘অমৃত অর্জন’ উপন্যাসের পরিসর মাত্র চল্লিশ পৃষ্ঠা হলেও এই উপন্যাসের ক্যানভাস পাঠককে একাত্তরের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। পাশাপাশি এই উপন্যাস এখনো বাংলাদেশের শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিদ্যমান ধনী-গরিব শ্রেণীবৈষম্যের এক বাস্তব চিত্রকেই চোখে আঙুল দিয়ে দ্রোহের পক্ষে উৎসাহিত করার মন্ত্র শেখায়। যে কারণে সোনালী ইসলামের এই উপন্যাস কেবল মৌলিকত্ব নিয়েই নয়, এটি শেষ পর্যন্ত শাসকের বিরুদ্ধে শোষিতদের লড়াই ও চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের জয়গান করতে পাঠককে প্রলুব্ধ করবে বলেই আমি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী।

সোনালী ইসলাম হয়তো দেয়াপাড়া গ্রামের এই গল্পটি আরো গল্পের পিঠে টেনে টেনে বড় করতে পারতেন। উপন্যাসের চাহিদা পূরণে চরিত্রগুলোকে আরো বিস্তৃতভাবে হাজির করতে পারতেন। শেকড় থেকে একেবারে শিখর পর্যন্ত সেই গল্পে আরো অনেক ডালপালা গজাতে পারত। যা উপন্যাসের দাবি মেটাতে হয়তো যতোটা প্রয়োজনীয় তার চেয়ে এই ক্ষুদ্র পরিসরের মৌলিক পটভূমিতে যে বিশাল ক্যানভাসের প্রেক্ষিত উন্মোচিত হতো, তা হয়তো পাঠক আরো প্রাণ জুরিয়ে উপভোগ করতেন। কিন্তু উপন্যাসের শর্ত পূরণ লেখকের জন্য কতোটা দায়, সেই সমীকরণের কী সত্যি সত্যি কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা আছে? সোনালী ইসলাম হয়তো ইচ্ছে করেই উপন্যাসের সেই স্বার্থ পূরণ করতে গিয়ে আলোচ্য উপন্যাসের মৌলিকত্ব নষ্ট করার ঝুঁকি নেননি। কারণ আমরা জানি, যে কোনো শিল্পমাধ্যমেই রূপ, রস, রঙ, ঘটনা, পরিপ্রেক্ষিত, পাত্রপাত্রী, আশয়-বিষয়, সম্ভাবনা, ঘটনার স্থান-কাল-পাত্র আর সেসব বিষয়ের সম্মিলিত উপস্থিতিই মুখ্য। শিল্পের দায়বোধ কতোটা মেটানো গেল, সেটাই মুখ্য বিষয় বিবেচনায় নিলে সোনালী ইসলাম বাংলা সাহিত্যে বিশেষ করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্বল্প পরিসরেও যে বিশাল ক্যানভাসের আলেখ্যকে পাঠকের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছেন, সেটা নিঃসন্দেহে একটি বস্তুনিষ্ঠ মৌলিক ও সৃজনশীল কাজ হিসাবে পাঠকের হৃদয় জয় করতে সক্ষম হবে।

আর যদি উপন্যাসের কঠোর দায়বোধকে বিবেচনায় নিতে চাই, তাহলে সোনালী ইসলামের আলোচ্য ‘অমৃত অর্জন’ আখ্যানকে বরং আমরা নভেলেট বলতে পারি। কারণ উপন্যাস হয়ে ওঠার জন্য সবধরনের মশলাপাতি, পাত্রপাত্রী, স্থান-কাল-ঘটনা, প্রেক্ষিত, বাস্তবতা, পটভূমি সকল সম্ভাবনাই আলোচ্য আখ্যানে উপস্থিত। কিন্তু ভাদ্র মাস পার হয়ে আশ্বিন মাসে ঘরের দাওয়ায় বসে অসময়ের বৃষ্টিতে শীত শীত লাগায় দামু যখন তার প্রয়াত মায়ের আক্ষেপ নিয়ে বিড়বিড় করেন, ‘দামু বে’ কর, তোরে কার হাতে রেখে মরি ক’ দিনি?’ দামু, তুই একটা বিয়ে কর নইলে কার কাছে মা ছেলেকে রেখে যাবে! মায়ের কাছে যে দামু’র একমাত্র পরিচয় ‘তুই একটা ভাদাইম্যা’, সেই দামু-ই কিন্তু গোটা আখ্যানে পাঠকের হৃদয়ের অন্তরালে এক অদৃশ্য মায়ার জগত তৈরি করে। কথাশিল্পী সোনালী হক ইচ্ছে করলে পাঠককে আশ্বিন মাসের অঝোর বৃষ্টির রিনিঝিনি গান শোনাতে পারতেন, গ্রাম-বাংলার জলে ডুবে থাকা সবুজ প্রান্তরের শাপলা-শালুকের মায়াবি দৃশ্য দেখাতে পারতেন, বর্ষাকালের গ্রামগঞ্জের পথঘাটের চিরায়ত দুর্দশার চিত্র ফোটাতে পারতেন, বৃষ্টিতে ভেজা প্রকৃতির নয়নাভিরাম দৃশ্যকে তুলে আনতে পারতেন, দিনের আকাশে মেঘেদের মায়াবি দৃশ্য ও রাতের আকাশে জোছনার প্রতিচ্ছবি ফোটাতে পারতেন। ঝোপঝাড়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনো শেয়াল দলের ডাকাডাকিতে পাড়ার ন্যাংটি ছেলেকে ভয় পাইয়ে দিতে পারতেন। গ্রামের দিন আনে দিন খায় এমন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষদের নিত্যকার কর্মযজ্ঞের চিত্রায়ন করতে পারতেন। মুক্তিযোদ্ধাদের আরো দু’একটা সাহসী অপারেশনের দৃশ্যকে জাহির করতে পারতেন। মধু মাঝি’র বাড়ির হাঁড়ির খবর পাঠকদের শোনাতে পারতেন। সাইদুল ঝোপের পাশে যে মাঝ বয়সি মহিলার সেবা নেয়, সেই মহিলার সেই পথে ওভাবে ঈশ্বরীর মত দাঁড়িয়ে থাকার রহস্যময় হেতু’র ডিটেইল বর্ণণা করতে পারতেন। যশোর ক্যান্টনমেন্টে পাক হানাদের নানান কিসিমের যুদ্ধ প্রস্তুতি ও অপারেশন বর্ণনা করতে পারতেন। আরো অনেক ঘটনাই এই আখ্যানের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত হয়ে এটাকে পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসের দাবি মেটাতে হয়তো যোগ্য করে তুলতো। কিন্তু সোনালী ইসলাম কেন যে অত্যন্ত সম্ভাবনাময়ী একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসকে এভাবে শব্দ কৌশলে স্বল্প ঘটনার বিবরণে পাঠককে কেবল মূল গল্পেই বেধে রাখেন, তা আমার কাছে রহস্যময় হয়েই থাকল।

পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসের দাবি মেটাতে আলোচ্য ‘অমৃত অর্জন’ আখ্যানের মীর পরিবারের অন্দর মহলের ঘটনাবলী, সৈয়দ পরিবারের ছেলে মাজেদের ময়মনসিংহের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবন ও যুদ্ধ জীবন, সৈয়দ পরিবারের যশোর শহরের জীবনযাপন, শামসু কাজী পরিবারের বড় মেয়ে কোথায় কী করে, সেই ঘটনার অনুল্লেখিত বিষয়বলী’র পাশাপাশি শামসু কাজী’র ছেলে মোতালেবের জীবন, স্ত্রী শরীফার অন্দরমহলের আরো খবর, শরীফার মামা বাড়ির খবর, কুসুমের শ্বশুরবাড়ির ঘটনাবলী, কুসুম ও হামিদুলের প্রেমকালীন সময়ের ঘটনাবলীও এই উপন্যাসে চিত্রায়িত হলে, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসের দাবি মেটাতে হয়তো পুরোপুরি সক্ষম হতো। একটা দেশে যখন যুদ্ধ চলে তখন কেবল পক্ষ ও প্রতিপক্ষের ব্যাপারগুলো থাকে না, তখন সেখানে চোরাকারবারি, মজুদদার, দখলবাজ, নারী লোলুপ, জগাই, মধাই, রাম, শ্যাম, যদু, মধু, রহিম, করিম, রহমত, আবুল, পীর সাহেব, নানান কিসিমের ফড়িয়া ও মাড়োয়ারিদের উৎপাত ও আর্বিভাব লক্ষ্য করা যায়। যা কাহিনী ও পটভূমি বিচারে এই মৌলিক সরল আখ্যানে দাবি মেটাতে কিছুটা ব্যর্থ হয়েছে।

আমি বিশ্বাস করি কথাশিল্পী সোনালী ইসলাম উপন্যাসের রিয়েল পাঠকের চাহিদা পূরণ করতে ভবিষ্যতে হয় ‘অমৃত অর্জন’ কে পুনর্লিখন করবেন নতুবা আরেকটি সম্পূর্ণ নতুন উপন্যাস লিখে পাঠকের সেই ক্ষুধা মেটাবেন। তবে স্বল্প পরিসরে আলোচ্য আখ্যানে সোনালী ইসলাম পাঠকের হৃদয় মন্দিরে যে ঢিবঢিবানি তুলেছেন, সেই পাঠতৃষ্ণা ভবিষ্যতে আরো ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হবেন বলেই আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। সোনালী ইসলামের ‘অমৃত অর্জন’ আখ্যানের জন্য আমার অন্তরনিঙরানো অভিনন্দন।

সোনালী ইসলামের ‘অমৃত অর্জন’ নভেলেটটি প্রকাশ করেছে বেহুলাবাংলা। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী মানবেন্দ্র গোলদার। বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪০। বইটির মূল্য রাখা হয়েছে দেশে ১৩৫ টাকা ও বিদেশে ৭ মার্কিন ডলার। বইটি বোর্ড বাঁধাই, অফসেট কাগজে ছাপানো হয়েছে। বইটি বাংলাদেশের সকল মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসর্গ করা হয়েছে।

২ মার্চ ২০১৬
ঢাকা