Home / বই আলোচনা / বই আলোচনা : ফজলে রাব্বি’র ‘গ্রন্থকেন্দ্রের দিনগুলো’

বই আলোচনা : ফজলে রাব্বি’র ‘গ্রন্থকেন্দ্রের দিনগুলো’

denguleবই আলোচনা : ফজলে রাব্বি’র ‘গ্রন্থকেন্দ্রের দিনগুলো’

শামীমা শ্যামা

আলোকিত জীবনের জন্য বই । এই আলোর পথে খুব অল্প বয়স থেকেই হেঁটেছেন আলোচ্য বইয়ের লেখক ফজলে রাব্বি। পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় প্যাকিং বাক্সের তক্তা দিয়ে আলমারি তৈরি করে কয়েকজন বন্ধু মিলে গড়ে তুলেছিলেন গ্রন্থাগার। বাড়ি বাড়ি গিয়ে বন্ধুদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা বই-ই ছিল এ পাঠাগারের বইয়ের মূল উৎস। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি সবসময়ই নিজেকে বইয়ের সাথে সম্পৃক্ত রেখেছেন। ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত চাকরি-জীবনের প্রথম ১৮ বছর তিনি বাংলা একাডেমির প্রকাশন, বিক্রয় ও মুদ্রণ বিভাগের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। আবার ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত শেষ ১৪ বছর জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। ‘গ্রন্থকেন্দ্রের দিনগুলো’ গ্রন্থটিতে ফজলে রাব্বি তাঁর চাকরি জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সুন্দর একটি বর্ণনা দিয়েছেন । গ্রন্থটি ২৮টি শিরোনাম দিয়ে রচিত হয়েছে। এটি মূলত স্মৃতিচারণমূলক একটি গ্রন্থ। এই গ্রন্থে লেখক জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে কর্মরত অবস্থায় বাংলাদেশের গ্রন্থজগতের নানাদিক দেখার যে সুযোগ পেয়েছিলেন সে সম্পর্কে একটি ধারণা দিয়েছেন। শুধু গ্রন্থজগত নয়, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের প্রধান হিসেবে আমলাতন্ত্রকেও তিনি খুব কাছে থেকে দেখেছেন- এর সুস্পষ্ট চিত্রও এ বইয়ের মাধ্যমে খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন ।
১৯৭৯ সালে সরকার তাঁকে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক পদে নিয়োগ করেন । সেখানে যোগদানের পর তিনি নানাবিধ গ্রন্থ উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেন । সে আমলে লেখক ফজলে রাব্বি সংস্থা-প্রধান হিসেবে ক্ষমতার কেন্দ্র হতে খুব বেশি দূরে ছিলেন না, কিন্তু ক্ষমতা উপভোগ করার সৌভাগ্য তাঁর হয়নি। এমনকি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রকে শক্ত আইনি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁর সে সময়ের স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে সেই কারণগুলো স্পষ্ট হয়েছে ।
পাকিস্তান আমল হতেই গ্রন্থকেন্দ্র প্রতিমাসে ‘বই’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতো, অনেকটা ‘সাহিত্য পত্রিকা’র মতো । গ্রন্থজগতের সকল পক্ষের সকল তথ্য যেন এই পত্রিকায় ফুটে ওঠে এবং পত্রিকাটি যেন গ্রন্থ-আন্দোলনে আদর্শের বাহক হয় সে ব্যবস্থা তিনি করতে চেয়েছেন। লেখক গ্রন্থকেন্দ্রে যোগদান করেই চিন্তা করলেন পাঠক সৃষ্টি ও পাঠাভ্যাস বৃদ্ধি করা যায় কীভাবে। তার একটি পদ্ধতি হিসেবে বেছে নিলেন ‘নববর্ষে প্রিয় জনকে বই উপহার’ কর্মসূচি। এখানে যোগদানের পরই ‘গ্রন্থসুহৃদ সমিতি’ সংগঠনের কাজ শুরু করেছিলেন, ফলে গ্রন্থসপ্তাহ বা বইমেলার আয়োজন করার সময় সমিতির সদস্যগণ সহায়ক-শক্তি হিসেবে কাজ করেছে । কিন্তু তিনি অবসরে চলে যাবার পর সরকারি কর্মকর্তারা গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক হয়ে আসেন এবং গ্রন্থসুহৃদ সমিতির কাজ বন্ধ করে দেন । লেখক বিশ্বাস করতেন গণগ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনাকে সম্প্রসারিত ও শক্তিশালী করা মানে পাঠাভ্যাস বৃদ্ধি ও প্রকাশনা শিল্পকে সম্বৃদ্ধশালী করা ।
প্রকৃতপক্ষে লেখকদের সহায়তার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যে বিশাল বাজেট থাকতো তার অর্থ নিছক অপব্যবহার হতো। মিথ্যা ভাউচার দিয়ে বুঝিয়ে দেয়া হতো বই কেনা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের পিয়ন হতে শাখা-প্রধান এই দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকতো; এমনিকরেই দেশে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়া হয়েছে। তিনি এসব থেকে গ্রন্থকেন্দ্রকে রক্ষা করার আপ্রান প্রয়াস চালিয়েছেন, ফলে তিনি সকলের শত্রুতে পরিনত হয়েছিলেন। এ গ্রন্থে তিনি তাঁর অভিজ্ঞতায় দেখেছেন বই নিয়ে একই মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন শাখা কাজ করলেও তাদের মধ্যে রয়েছে চরম সমন্বয়হীনতা । এমনকি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে কোনো শুভ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সবসময় নিজেকে অসহায় হিসাবে আবিষ্কার করেছেন । তিনি দেখেছেন আমলাতন্ত্রের কাজ হচ্ছে– ‘সকলে মিলে চুরি করো কোনো দোষ নেই । কিন্তু একা খেয়ো না । সাবধান।‘ প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা জেলার কর্মকর্তা হিসেবে বেশ সুযোগ সুবিধা ভোগ করতেন। তাই তারা ঢাকার কনো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ‘প্রধান’ পদের প্রতি আকর্ষণ বোধ করতেন । প্রকৃতপক্ষে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাজের প্রতি তাদের কোনো আকর্ষণ থাকতো না, বরং আকর্ষণ থাকতো সেই প্রতিষ্ঠানের গাড়িসহ অন্যান্য সুযোগসুবিধার প্রতি। অদ্ভুত সেই সরকারি ব্যবস্থাপনা- সরকারি কর্মকর্তারা গণগ্রন্থাগারকে তথাকথিত ‘অধিদপ্তর’ নাম দিয়ে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে দীর্ঘকাল।
১৯৭৮ তে পরিচালক হয়ে আসার পর তিনি ইউনিসেফ এর সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক শিক্ষাবর্ষ উদযাপন কার্যক্রম হিসেবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ‘ভ্রাম্যমাণ বইমেলা’র আয়োজন করেছিলেন । বই প্রকাশনার বাইরে বই প্রচারণা ও উন্নয়নের কাজ যে অনেক আনন্দের- বিশাল ও বিচিত্র, তখনই তা অনুধাবন করেন এবং প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের শিশুরা প্রথম পাঠ্যবইয়ের বাইরেও যে বই আছে- সে সম্পর্কে ধারনা অর্জন করে। বাংলা একাডেমিতে থাকাকালে পালনকৃত দায়িত্ব তিনি নিজ আগ্রহে গ্রন্থকেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন । ১৯৬৪-১৯৬৫ সালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উদ্যোগে ‘শিশু গ্রন্থমেলা’র আয়োজন করা হয়েছিল, যা ছিল এই ভূখণ্ডে আয়োজিত ‘প্রথম বইমেলা’ । তিনিই বইমেলাকে ঢাকা থেকে সারাদেশে ছড়িয়ে দেবার ঐতিহাসিক উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
ফজলে রাব্বি জাতীয়ভাবে বাংলা মুদ্রণের দু’শত বর্ষ উদযাপনের লক্ষে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেছেন । ব্রিটিশ কাউন্সিলের মাধ্যমে ‘পুস্তক বিক্রয় প্রশিক্ষণ কোর্স’ পরিচালনা করেছেন । বাংলা বইয়ের বাজার সৃষ্টির লক্ষে দিল্লিসহ অন্যান্য প্রদেশে বইমেলা করেছেন। একইভাবে ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে ভারতীয় বই মেলার আয়োজন করেছেন । কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে যারা অসচ্ছল তাদের গ্রন্থ প্রকাশ করার লক্ষে ‘তহবিল গঠন’ করে গ্রন্থকেন্দ্র থেকে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করেছেন, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত বইয়ের ‘আইএসবিএন’ (ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড বুক নাম্বার) চালুর ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন । তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টাতেই ‘গ্রন্থকেন্দ্রের নিজস্ব ভবন’ তৈরি হয়েছে ।
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে কর্মজীবনের ১৪ বছরকে তিনি কয়েকটি পর্ব এবং উপপর্বে ভাগ করেছেন । বিশেষত এ কালগুলো ছিল- রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং রাষ্ট্রপতি এরশাদের কাল । এরশাদের আমলে বহু মন্ত্রী ও সচিব পরিবর্তন হয়েছে । একেক সচিব ছিলেন একেকরকম মেজাজের এবং একেক মন্ত্রী একেক মতলবের । সমস্যা ছিল– প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রন্থকেন্দ্র ছিল অনেক ছোট এবং এর বাজেট ছিল ততোধিক ছোট। কিন্তু গ্রন্থ উন্নয়নের কাজে যে অনেক আনন্দ তারই আকর্ষণে লেখক গ্রন্থকেন্দ্রের সাথে সবসময়ই যুক্ত থাকার চেষ্টা করেছেন । এ জন্য তাঁকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে । এরশাদের আমলে কতিপয় স্বার্থান্ধ আমলার প্ররোচনায় ‘জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রকে অবলুপ্ত করে বাংলা একাডেমির সাথে একীভূত করা’র যথেষ্ট চেষ্টা চালানো হয়েছে । তিনি এ প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সমাজের সুধিজন যেমন- কবি শামসুর রাহমান, এনায়েতুল্লাহ খানসহ নানাজনকে দিয়ে পত্রিকায় কলাম লিখিয়েছেন। এভাবেও আমলাচক্রকে প্রতিহত করতে না পেরে তিনি এরশাদের পীর আটরশীর পীরের কাছে পর্যন্ত ছুটে গিয়েছিলেন । এভাবে তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠানটির মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে । প্রথাগত আমলাতন্ত্রের বিরোধিতার কারনে ১৯৯২ সালে অবসর গ্রহনের পর তাঁর দীর্ঘ বত্রিশ বছরের চাকরিকে বেসরকারি ঘোষণা করা হয় এবং তিনি শুন্যহাতে অবসর নেন। তাঁর চেষ্টা এবং সততার ফল হিসেবে এরকম একটি পরিনতি খুবই দুঃখজনক । কিন্তু গ্রন্থকেন্দ্র থেকে অবসর নিলেও তিনি গ্রন্থজগত হতে অবসর নিতে পারেননি। যখন গ্রন্থকেন্দ্রের স্মৃতিচারন লিখছেন তখন তিনি অভিবাসন নিয়ে কানাডার টরেন্টো শহরে । তাই সম্পূর্ণ স্মৃতিনির্ভর হয়ে তিনি বইটি লিখেছেন তাঁর এই বই বাংলাদেশের গ্রন্থ ও গ্রন্থাগার আন্দোলনের জন্য একটি মাইলফলক এবং এটি সব সময় আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রানিত করবে বলে আশা করা যায় ।
গ্রন্থের নাম : গ্রন্থকেন্দ্রের দিনগুলো
লেখক : ফজলে রাব্বি (১৯৩৫-)
প্রকাশক : অন্বেষা গবেষণা কেন্দ্র
প্রচ্ছদ : চারু পিন্টু
পৃষ্ঠাসংখ্যা : ১৫২
মূল্য : ২০০ টাকা
প্রাপ্তিস্থান : অন্বেষা গবেষণা কেন্দ্র; ঢাকা ১২১৬।
ফোন- ০২ ৮০৮০৫৬২