Home / বই আলাপ / পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ মাসউদুল হকের উপন্যাস `দীর্ঘশ্বাসেরা হাওরের জলে ভাসে’ -সাদিয়া সুলতানা

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ মাসউদুল হকের উপন্যাস `দীর্ঘশ্বাসেরা হাওরের জলে ভাসে’ -সাদিয়া সুলতানা

boinews-d-123454পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ মাসউদুল হকের উপন্যাস `দীর্ঘশ্বাসেরা হাওরের জলে ভাসে’
-সাদিয়া সুলতানা

হাওরের মানুষের জীবন কেমন? সেই জীবনের রসদ কি কেবল বিপুল জলরাশির অবারিত সৌন্দর্য? নাকি বর্ষার পানির তোড়ে অভাবের হাহাকারে বিপর্যস্ত জনপদের পত্রিকার শিরোনাম হওয়াই এর একমাত্র ভবিতব্য? পত্রিকার পাতায় হাওরের ছবি দেখে চার দেয়ালের মধ্যে যাপিত জীবন নিয়ে হিশেব কষে দিনাতিপাত করা মানুষের জন্য এক অনন্য সাধারণ বই গদ্যকার মাসউদুল হকের প্রথম উপন্যাস `দীর্ঘশ্বাসেরা হাওরের জলে ভাসে।’ যে জীবন আমি নিজে দেখিনি সে জীবনে যেন লেখক আমাকে হাত ধরে নিয়ে যান। কড়ায়গন্ডায় জীবনের হিশেব বুঝে নিতে যখন ব্যস্ত সবাই তখন কোনো কোনো মানুষ কান পেতে অন্যের জীবনের গল্প শোনেন, প্রান্তিক মানুষের দীর্ঘশ্বাসের গভীরতা পরিমাপ করেন। অন্তহীন পানির সাথে অভাবের অবাধ বিচরন আর নিরন্তর বোঝাপড়ার আখ্যান এই `দীর্ঘশ্বাসেরা হাওরের জলে ভাসে।’ এই উপন্যাসের পাতায় পাতায় হাওরের জলের মতো প্রবাহিত হয়েছে হাওরের মানুষের দীর্ঘশ্বাসের গল্প।
বাংলাদেশের হাওরের পানির উৎস হলো ভারতীয় এলাকা থেকে উৎপন্ন নদী ও সীমান্তবর্তী পাহাড় থেকে নেমে আসা নানা পাহাড়ি ছড়ার পানি যা পাহাড় ধুয়ে মাটিতে এসে এই এলাকার জমিকে উর্বর করেছে আবার নদীগুলির নাব্যতাও  হ্রাস করেছে। নদীর এই জলবৈচিত্র্য আর বঞ্চনার গল্পই লেখক বলেছেন এই উপন্যাসে। হাওরের মানুষের জীবনকে শাসন করে পানি। সেই পানিকে ঘিরে ক্রিয়াশীল থাকে দাদন ব্যবসায়ী, সারের ডিলার, সেচ কারবারি, জলমহালের ইজারাদাতার মতো সুযোগসন্ধানী নানা পেশার মানুষ। এসব চক্রের প্রভাব আর `অজগর সাপের মতো শিকারকে জাপটে ধরা’ অভাবের সাথে বসবাসকারী টাঙ্গুয়ার হাওরের মানুষের জীবনের গল্পগুলো ছোট ছোট বাক্যবিন্যাসে অপূর্বভাবে চিত্রায়িত করেছেন লেখক। লেখক যখন বলেন, `হাওরের মানুষ তাই ঘুম না আসা মানুষের মতো এপাশ ওপাশ করে জন্মাবধি জীবনযাপন করে’ তখন যেন চোখের সামনে হাওরের মানুষের পুরো জীবনচক্র দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ১৮৮ প্রষ্ঠার বইটি থেকে এরকম অসংখ্য বাক্য উদ্ধৃত করা যাবে যা পাঠকের মনে একেবারে গেঁথে যাবে।
এই উপন্যাসের চরিত্র-বিন্যাসের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এখানে কোন বিশেষ পুরুষ বা নারী চরিত্র কেউ কাউকে ছাপিয়ে প্রধান হয়ে উঠতে পারেনি বা হয়ে ওঠেনি। এছাড়া এই উপন্যাসে সংলাপ তুলনামূলক কম। তবে আঞ্চলিক ভাষার সংলাপগুলো বেশ সুখপাঠ্য। উপন্যাসের প্রথম চরিত্র ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে বারো বছর আগে স্নাতক পাশ করে হাওর অঞ্চলের দুর্গমতর জনপদ সুনামগঞ্জের ধরমপাশা উপজেলা ছাড়িয়ে মধ্যনগর থানা পেরিয়ে চামরদানি ইউনিয়নের চামরদানি হাইস্কুলের শিক্ষক আফাজ মাস্টার। অভাবের সাথে সম্পর্কচ্ছেদের অভিলাষে একসময়ের শহরবাসী আফাজ মাস্টারের পাড়াগাঁয়ে প্রত্যাবর্তনের পেছনের কারণ তার সহজ হিশেবের জীবন যাপন আর তার দাদার প্রতিষ্ঠিত স্কুলের হাল ধরার প্রত্যাশা। হাওরের অভাবের জীবনে শীতের পাতার মতো ঝরে যাওয়া ছাত্ররা যখন বাল্যবিবাহ আর অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে আর কাজের সন্ধানে চলে যায় দূর পার্বত্য এলাকায় তখন বুকে ব্যথার পাহাড় নিয়ে ছাত্রছাত্রীর খোঁজে বাড়ি বাড়ি ছুটে বেড়ান আফাজ মাস্টারেরা।
আফাজ মাস্টারের পর একে একে অনেক চরিত্রের অণুপ্রবেশ ঘটে এই উপন্যাসে। ধরমপাশা থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তার আতিকুর রহমান, প্রান্তিক কৃষক তবারক, দাদন ব্যবসায়ী আখের মিয়া, ব্যাংক ম্যানেজার কুদ্দুস, আখেরের পুত্র সোলেমান, তাজুল চেয়ারম্যান, ধরমপাশার সবচেয়ে বড় বিল নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবসায়ী আয়নাল, চাঁদপুরের হাইমচর থেকে ভাগ্যান্বেষনে আসা সফদরের বাবা সেলাম, সফদরের ছেলে বাতেন, আখেরের শালী রুমা, খোকন এসব চরিত্রের সাথে সাথে টাঙ্গুয়ার হাওর পাড়ের আদি বাসিন্দা হাজং, সাধারণ মানুষের জীবনে শেকড়ের মতো গেড়ে থাকা কুসংস্কার, ফসল নষ্ট হবার অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ফসলের জন্য আরাধনা এসব বিষয়ের সাথে এই উপন্যাসের পথ পরিক্রমায় আমরা পরিচিত হই। তবে এই উপন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হচ্ছে, জলমহাল ইজারার নেপথ্যের ঘটনাবলী লেখক দক্ষতার সাথে বর্ণনা করেছেন।
প্রকৃতির সাথে সমঝোতা করে বেঁচে থাকা হাওরের মানুষগুলো  ঋতু পরিক্রমায় অবলোকন করে হাওরের বৈচিত্র্যময় রূপ। বর্ষার থৈ থৈ হাওরের রূপবদল হয় চৈত্রে। চৈত্রে গুমাই, ঘাসি, কংস নদী হয় কংকালসার। তখন বৃষ্টির আশায় ব্যাঙের বিয়ে দিতে মেয়েরা গান ধরে, বেঙাই মারে নাকে ফোটা/মেঘ পড়েছে ছইলতা ফোটা/ও বেঙাই মেঘ আন গিয়া। আবার বৈশাখের ঝড়-বৃষ্টির হাত থেকে ফসল রক্ষার জন্য ‘হিরালি’ আচারের মাধ্যমে হিরাল বা পিরালরা কৃষকের সাথে তার জমিতে যেয়ে নানা মন্ত্রপাঠ করে। একসময় সকল বাঁধা পেরিয়ে যখন কৃষষের ঘরে ফসল ওঠে তখন অনাবিল আনন্দে মুখরিত হয় জনজীবন। এসবের সাথে সাথে এই উপন্যাসের খোপে বন্দি আছে জল-অধিপতিদের কাছে শোষিত মানুষের হাহাকার আর পানির উপর আধিপত্য নিয়ে বিস্তৃত দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ভয়াবহ রূপ।
এই উপন্যাসের যে অংশটুকু হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কাটে সেটি হলো, আফাজ মাস্টারকে লেখা তার স্কুলের ঝরে যাওয়া ছাত্র আব্দুল বাতেনের চিঠি, যে চিঠিতে বাতেন নিজের জীবনের গল্প বলতে বলতে হালকা হয়। অভাবের তাড়নায় স্কুল ছেড়ে যাবার পর বাতেনের জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত আর বাতেনের জীবনবোধ পাঠককেও তাড়িত করে। আফাজ মাস্টার একদিন খুব ভোরে ট্রলার ভাড়া করে খাল, বিল নদী পার হয়ে তাহিরপুরে রক্তি নদীর পাড়ে চলে যায় যেখানে শত শত মানুষ নগরায়ণকে গতিশীল করতে বুক পানি, গলা পানিতে নেমে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে বালু তোলে। এই বালু শ্রমিকদের ভিড়ে আবেগে ক্ষতবিক্ষত আফাজ মাস্টার খুঁজে পান হিরু, বাতেনসহ অনেক প্রাক্তন ছাত্রকে। যাদের শরীর রুগ্ন-শীর্ণ, গায়ে কাপড় আর মাংসের বালাই নেই, পরনে কেবলমাত্র শতছিন্ন প্যান্ট।
এদের দেখে নিজের অপারগতায় আফাজ মাস্টার লজ্জা পান। তার মনে হয় আশেপাশের মানুষ হয়তো ভাবছে, `কেমন মাস্টার, যার এতডি ছাত্র স্কুল ছাইড়া বালু তুলতো জমা অইছে।’ এই ছাত্রদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি কাজী নজরুল ইসলামের কষ্টকর জীবনের গল্প বলেন। কিন্তু তার প্রাক্তন ছাত্ররা শ্রমজীবী বলে তাদের কাছে আবেগের চেয়ে সময়ের দাম বেশি তাই তারা কাজের তাগিদে একে একে চলে যায়। শুধু বাতেন একটি পুটলি নিয়ে তার শিক্ষকের সাথে ট্রলারে ওঠে। আফাজ মাস্টার মনে মনে ভাবেন,  `ছোট্ট প্রদীপ অন্ধকারের বিশাল গহ্বরকে জয় করতে পারে না, অন্ধকারে থাকা মানুষদের আলোর পথ  দেখাতে পারে শুধু।’  একসময় ভাবতে ভাবতে আফাজ মাস্টারের বুক থেকে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে আর শিক্ষকের জন্য বাতেনের ছোট বুকেও বুদবুুদের মতো দীর্ঘশ্বাস তৈরি হতে থাকে। এই দৃশ্যপটের সাথেই সমাপ্তি ঘটে `দীর্ঘশ্বাসেরা হাওরের জলে ভাসে’ উপন্যাসের।

২০১৭ সালে ধ্রুব এষের করা নান্দনিক প্রচ্ছদে কথাশিল্পী মাসউদুল হকের `দীর্ঘশ্বাসেরা হাওরের জলে ভাসে’ উপন্যাসের তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেছে `চৈতন্য’ প্রকাশনী। উপন্যাসটি যে বাংলা সাহিত্যজগতে একটি স্থায়ী অবস্থান করে নিতে যাচ্ছে তা এর পাঠে মন দিলেই নিশ্চিত হওয়া যায়।