Home / বই আলাপ / আমার বই আমার কিছু কথা-রবিশঙ্কর মৈত্রী

আমার বই আমার কিছু কথা-রবিশঙ্কর মৈত্রী

 

123

আমার বই আমার কিছু কথা-রবিশঙ্কর মৈত্রী

নিজের লেখা নিয়ে বিনীতভাবে আজ কিছু বলতে চাইছি। আমার বলাটা হয়তো-বা নতুন লিখিয়েদের কাজে লাগতেও পারে।

আমার প্রথম বই উপন্যাস– জলগৃহ, প্রকাশিত হয় ১৯৯৫ সালে। ১৯৯৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে আমি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সবেতন চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর লেখার মধ্যেই ডুবতে থাকি।
১৯৯৬ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত বাংলাভাষা আর আবৃত্তি বিষয়ক লেখালেখি করেছি গভীর মনোযোগে । তখন বাংলাবাজারের কজন প্রকাশকের হয়ে অনেক কাজ করেছি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ বেতার বাণিজ্যিক কার্যক্রমের প্রচুর স্ক্রিপ্ট লিখেছি। কণ্ঠ দিয়েছি বেতার এবং টেলিভিশনে।
সেই সময়ে সংসারটা একটু ঠেলে ঠেলেই চালাতে হত। তবুও ভালোই ছিলাম। বিশেষ কোনো দুঃখ ছিল না। সেই এক দশকে আমার দারুণ সব বই বেরিয়েছিল– দেশি বাংলা শব্দের অভিধান, বিদেশি বাংলা শব্দের অভিধান, বাংলা উচ্চারণের নিয়ম, সুন্দর কথা বলবেন কীভাবে, আবৃত্তির সহজপাঠ, এই বইটি আবৃত্তির, আধুনিক বাংলা বানান অর্থ উচ্চারণ অভিধান, আমরি বাংলাভাষা। উপন্যাস কবিতাও ছিল পাশপাশি।

আমি তখন তুমুল বেগে আবৃত্তিকর্ম করছিলাম সারা দেশে, সাংগঠনিকভাবে। একদিন শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটে আমাদের আবৃত্তি সংগঠন স্বরবৃত্তের মহড়া শেষে একটু দলছুট হয়ে কী যেন ভাবছিলাম। হঠাৎ শুনি, আমাদের দলের কোনো একজন বলছে, ‘দাদা তো বেকার মানুষ, কিছুই করে না তেমন, নির্দিষ্ট ইনকাম সোর্স নেই।’
তখনও সংগঠনে আমি যথাসাধ্য চা-নাস্তার পয়সা দিই। অন্যদেরকেও তখন অংশ নিতে অনুরোধ করি। সেই আজিজসন্ধ্যায় আমার অহংবোধে খুব লেগেছিল। খুবই বেদনাহত হয়েছিলাম। পরদিনই বাংলাভিশন কর্তৃপক্ষ এবং শামীম শাহেদের প্রস্তাবে রাজি হয়ে প্রযোজক হিশেবে যোগদান করেছিলাম। তারপরের গল্প বেশ লম্বা।
বাংলাভিশন, আরটিভি এবং আমাদের নিজস্ব চ্যানেল গানবাংলা থেকে আমি কী পেয়েছি কী হারিয়েছি– সে-সব এখানে বলবার নয়। এখানে আমি শুধু নতুন লিখিয়েদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই– লেখার সঙ্গে দেখা হবার পর আর কোনোদিক না-দেখাই ভালো। চাকরি, সংগঠন ইত্যাদি প্রভৃতি করার পরে আর লেখালেখি হয় না। অর্থপূর্ণ কিছু লিখতে হলে জীবন নিংড়ে পুরোটাই দিতে হয়।

২০১৩ সালে আমার জীবনে চরম দুর্দশা নেমে আসে। একে একে জীবনের ব্যয় ভার হয়ে ওঠে। সুস্বচ্ছল জীবন থেকে আমাদের গাড়িটাও বিক্রি করে দিতে বাধ্য হই। আবার আমি মুক্ত মানুষ হয়ে বাংলাদেশ বেতার, টেলিভিশন, এটিএন বাংলা, আরটিভি, জিটিভিতে খণ্ড খণ্ড কাজ করে নিজেকে অখণ্ডমণ্ডলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করি।
মামলা আর মৃত্যুভয় মাথায় নিয়েও লিখতে থাকি ‘একলা সুখের শূন্য দুপুর’, ‘পাখিবাগান’। বুঝতে পারি চরম সঙ্কটেও আমি এক নতুন ভাষালাভ করছি। আমার লেখা নতুন পথের সন্ধান পেয়েছে।

২০১৪ সালের ২৬শে অক্টোবর থেকে আমি বাধ্যপ্রবাসী। ফ্রান্সপ্রবাসী হয়ে দেশাতুর এই আমি এখনো ঝঞ্ঝাট মুক্ত হতে পারিনি। ২০১৫ সালের ২৪শে নভেম্বর থেকে ঘরের মধ্যে মৃত্যুগন্ধ নিয়ে আমরা বেঁচে আছি। শত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আমি এখনও লিখছি কেবল। ‘মুক্ত মানুষ’, ‘কথাবুদ্ধ’, ‘বোতাম খোলা নোনা হাওয়া’, ‘মনভাসির টান’, ‘প্যারিস থেকে ফেরা না ফেরা’, ‘যাও কিছু রেখে যেও না’– এইসব নতুন ঘ্রাণপ্রাণযুক্ত বই আমাকে সাহসী করে তুলেছে। প্রবাসী হবার পরও আমার নয়টি বই প্রকাশিত হযেছে।

২০১৭ সালের বইমেলায় আমার চারটি বই প্রকাশিত হয়েছে। বইগুলো স্নেহভাজন মেকদাদ হাসান রানা ডাকযোগে পাঠিয়েছে। আজ সকালেই পেয়েছি নতুন এবং আগের কিছু বই।
২০১৪ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত প্রকাশিত বইগুলো আজ অনেকক্ষণ উল্টেপাল্টে দেখে মনে হল– আমার নতুনতর লেখায় আত্মতুষ্ট হবার মতো কিছু আছে বটে– কিন্তু তা মুগ্ধ হবার মতো নয়। আজ আবার নতুন করে তাড়িত হচ্ছি, মনে হচ্ছে– আরো নিখুঁত, আরো নির্ভুল, আরো অর্থপূর্ণ, আরো সম্পূর্ণ করে তুলতে হবে আমার বিগত সকল লেখাকে। নতুন লেখার নেশায় ঘোড়া ছোটালে আমার আগের সকল কর্মই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

নিজের লেখা নিয়ে আমার আনন্দ আছে বটে, অন্ধমোহমুগ্ধতা নেই। আজ থেকে আমার রচনাগুলিকে আরো গভীর মনোযোগে সম্পন্ন এবং সম্পূর্ণ করে তুলতে ব্রতী হলাম।