Home / বই আলাপ / আমাদের রাজনীতির পুরোটাজুড়েই বেদনা আর ব্যর্থতার বর্ণমালা-আমীন আল রশীদ

আমাদের রাজনীতির পুরোটাজুড়েই বেদনা আর ব্যর্থতার বর্ণমালা-আমীন আল রশীদ

amin

আমাদের রাজনীতির পুরোটাজুড়েই বেদনা আর ব্যর্থতার বর্ণমালা-আমীন আল রশীদ

আজ বইনিউজের সাথে কথায় সাংবাদিক-কবি আমীন আল রশীদ-এর সাথে

বইনিউজ : কতদিন ধরে বই পড়া? কত দিন ধরে লেখা?
আমীন আল রশীদ : বই বলতে যা বোঝায়, তা তো স্কুলে যাবার আগে থেকেই শুরু। কিন্তু আপনি এখানে বই বলতে বুঝিয়েছেন পাঠ্যবইয়ের বাইরের পুস্তক। সেটি ঠিক নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। কারণ পাঠ্যবইয়ের বাইরে প্রথম কী পড়েছি মনে নেই। তবে লেখালেখির শুরু সম্ভবত ক্লাস নাইনে বসে এবং অবশ্যই লেখকদের কমন বিষয় ছড়া বা কবিতা দিয়ে লেখালেখিতে হাতেখড়ি। এরপর কবিতায় মোটামুটি স্থির। লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে সম্পর্ক। মাঝেমধ্যে দুয়েকটা প্রবন্ধ লেখার চেষ্টা। এভাবেই শুরু।
বইনিউজ : সামনে বইমেলা। নতুন বই পাঠকরা পাবেন কি? আগামী কবিতা গ্রন্থ সম্পর্কে বলুন।
আমীন আল রশীদ : এবার ‘জঙ্গিবাদ, গণতন্ত্র, আইনের শাসন’ নামে একটা বই আসছে। বের করছে ঐতিহ্য। এটা একেবারেই সাম্প্রতিক এবং সিরিয়াস ইস্যুতে লেখা। কবিতার বইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত আছে। তবে এবার বের করার ইচ্ছে নেই। আগামি বইমেলায় চেষ্টা করা যেতে পারে। কারণ একই বইমেলায় জঙ্গিবাদের মতো ইস্যুর পাশাপাশি কবিতার বই প্রকাশ করলে পাঠকের মনে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
বইনিউজ : নিজের বই ও লেখালেখিতে কতটা আনন্দ-বেদনা কাজ করে নিজের ভেতরে বিস্তারিত বলবেন কী?
আমীন আল রশীদ : আমার মনে হয় সব লেখার পেছনেই একটা বেদনা থাকে। খুব আনন্দিত অবস্থায় কখনো কিছু লিখেছি বলে মনে পড়ে না। বিশেষ করে আমার সব কবিতার নেপথ্যেই একটা দুঃখবোধ আছে। যখন কবিতায় স্যাটেয়ার করি, তারও আড়ালে একধরনের বেদনা থাকে-যা হয়তো অনেক সময় পাঠক ধরতে পারেন না। তবে কবিতার বাইরে আমি মূলত রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে লিখি। আমাদের রাজনীতির পুরোটাজুড়েই তো বেদনা আর ব্যর্থতার বর্ণমালা।
বইনিউজ : বছর জুড়ে কেমন সব কবিতা লিখলেন?
আমীন আল রশীদ : কবিতা তো হিসাব করে লেখার জিনিস না। গত দুই মাসেও একটা কবিতা লিখেছি বলে মনে পড়ে না। কবিতা আসলে আমি খুবই কম লিখি বা লিখতে পারি। আমার লেখালেখির শুরুটা কবিতা দিয়ে হলেও পরে সেখানে যথেষ্ট বাঁক বদল হয়েছে। এখন মূলত রাজনৈতিক বিষয়ে লিখতেই সাচ্ছন্দ্যবোধ করি এবং এ বিষয় নিয়েই নিয়মিত লিখি বা লিখতে হয়।
বইনিউজ : সারা বছর কী কী বই পড়লেন? কেমন লাগলো? ভালোলাগাটা আমাদের সঙ্গে শেয়ার করলে জানতে পারব।
আমীন আল রশীদ : বই পড়ার ক্ষেত্রেও একই কথা। হিসাব করে বই পড়া হয় না। তবে আমার পড়ার সবচেয়ে পছন্দের বিষয় জীবনানন্দ। গত অক্টোবরে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী সামনে রেখে দুটি নিবন্ধ লেখার প্রয়োজনে জীবনানন্দের এবং তার বিষয়ে বেশকিছু লেখা নতুন করে পড়তে হয়েছে।এর মধ্যে ক্লিনটন বি সিলির ‘অনন্য জীবনানন্দ’, ক্ষেত্র গুপ্তর ‘জীবনানন্দ: কবিতার শরীর’, তপন রায়চৌধুরীর ‘বাঙালনামা’ উল্লেখ করা যায়। যেকোনো বিষয় আপনি ১০বছর আগে যা পড়েছেন, আজ সেটি পড়লে মনে হবে আজই পড়লেন। এটা বাঙালির জীবনে ভাতের মতো; প্রতিদিনই নতুন।
বইনিউজ : আপনার কবিতা ওপর কোনও কবির প্রভাব থাকলে তা নিয়ে আপনার নিজের মধ্যে বোঝাপড়া বলুন।
আমীন আল রশীদ : স্টাইলে কারো প্রভাব নেই। তবে শব্দ ব্যবহারে (ঘোড়া, ঘাস, নদী) অনেকের কাছে জীবনানন্দে প্রভাবিত মনে হতে পারে এবং সেটি হলে আমার আপত্তি বা লজ্জা নেই।
বইনিউজ : লেখালেখি নিয়ে আপনার চিন্তাটা জানাবেন? কীভাবে, কেমন লিখতে চান?
আমীন আল রশীদ : আমার লেখালেখির মূল ভাবনায় থাকে মানুষের অধিকার। বিশেষ করে মত প্রকাশের স্বাধীনতা বিষয় হিসেবে আমার সবচেয়ে বেশি পছন্দের। আমি এটা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এমন হওয়া উচিত যে, সেটি রাজনৈতিক, সামাজিক বা ধর্মীয়ভাবে যত গুরুত্বপূর্ণ বা যত স্পর্শকাতরই হোক-নাগরিকরা সে বিষয়ে যেকোনো মাধ্যমে শালীনভাবে যুক্তিপূর্ণ উপায়ে কথা বলতে ও লিখতে পারবেন এবং সেটি আদালত সম্পর্কিত হলেও যদি সেখানে আদালতকে হেয় না করা হয় এবং যদি সেটা যুক্তিপূর্ণ হয়-তাহলে আদালত ওই নাগরিককে তলব করবেন না বা তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা হবে না। এটি নিশ্চিত করা গেলে ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতার বাইরের কোনো দল বা গোষ্ঠীর ক্ষতি তো হবেই না, বরং তারা নিজেদের দুর্বলতাগুলো জানতে পারবে এমনকি মহামান্য আদালতও বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে নাগরিকের অভিমত জানতে পারবেন এবং কোথাও দুর্বলতা থাকলে সেগুলো শোধরানোর সুযোগ পাবেন। গণতন্ত্রের প্রধানতম শর্ত হচ্ছে ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধা। আমি মনে করি, প্রতিটি বিষয়ে প্রতিটি মানুষের ভিন্ন ভিন্ন চিন্তা থাকতে পারে এবং প্রতিটি চিন্তাকেই আমাদের শ্রদ্ধা করা উচিত।আমি কারো সাথে ভিন্ন মত পোষণ করি, এই অর্থ এই হতে পারে না যে, আমি তাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করব বা ৫৭ ধারায় মামলা ঠুকে দেব।
বইনিউজ : বই পড়া ও কবিতা লেখা নিয়ে পাঠক ও নতুন প্রজন্মের কবিদের প্রতি আপনার কোন পরামর্শ?
বই পড়ার ক্ষেত্রটি উন্মুক্ত রাখা উচিত। তবে লেখালেখির প্রয়োজনে কিছু বই খুব সহায়ক হতে পারে। যেমন সৈয়দ শামসুল হকের ‘মার্জিনে মন্তব্য’, আন্দ্রে মারোয়ার ‘জীবনযাপনের শিল্পকলা’ (কবীর চৌধুরী অনূদিত), তপন রায়চৌধুরীর ‘রোমন্থন অথবা ভিমরতিপ্রাপ্তর পরচরিতচর্চা’, শহীদুল জহির সমগ্র আর সেইসাথে জীবনানন্দ তো বটেই। কবিতা লেখার বিষয়ে কোনো পরামর্শ নেই। কারণ এ বিষয়ে পরামর্শ দেবার মতো যোগ্যতা এবং এখতিয়ার কোনোটাই আমার নেই।
বইনিউজ : বইমেলা, বই প্রকাশ, প্রকাশ মাধ্যম ইত্যাদি নিয়ে আপনার কোন কথা বলার থাকলে জানতে আগ্রহী।
আমীন আল রশীদ : ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা মুদ্রিত বইয়ের পাঠক কমিয়েছে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আমি নিজেই তার প্রমাণ। সুতরা এই ইন্টারনেট সময়েও অমর একুশে বইমেলাকে ঘিরে লাখো মানুষের/পাঠকের/লেখকের যে সমাগম হয়-এটা একটা বিস্ময় বটে! বইমেলার কলেবর বেড়েছে। কিন্তু মূল মেলাটা বাংলা একাডেমির বাইরে চলে যাওয়ার পর এটিতে প্রাণ কমে গেছে বলে আমার মনে হয়। এটা আমার একেবারেই ব্যক্তিগত অনুভূতি। প্রকাশকরা আমার সাথে একমত হবেন না।বইমেলায় বাংলা একাডেমির এখতিয়ার ও ক্ষমতার সীমা নিয়ে অনেক কথা বলা যায়। এই ফোরামে আর বলতে চাই না। এ নিয়ে সম্প্রতি আমি বিভিন্ন জায়গায় লিখেছি। ফলে আর চর্বিত-চর্বন করতে চাই না।