Home / বই আলাপ / ঢাকাকেই আমি বাংলা ভাষার মূল চারণভূমি মনে করি

ঢাকাকেই আমি বাংলা ভাষার মূল চারণভূমি মনে করি

12471781_10153427340677199_

আসছে বইমেলার জন্য কবি-প্রাবন্ধিক ফকির ইলিয়াস-এর সাথে বইনিউজের কথামালা।
 

বইনিউজ : কতদিন ধরে বই পড়া? কত দিন ধরে লেখা?
ফকির ইলিয়াস : বইপড়া শুরু, যখন পাঠশালা পাস করে হাইস্কুলে যাই। সিলেটে ‘কেন্দ্রীয়
মুসলিম সাহিত্য সংসদ'(কেমুসাস)-ছিল আমাদের বইয়ের আড়ত ঘর। এর গ্রন্থগারিক
ছিলেন মুহম্মদ নুরুল হক। তিনি ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম লাইব্রেরিয়ান। তিনি তরুণদের বই পড়ার আলো জ্বালিয়ে দিতেন।দেখে দেখে বলতেন- এই বই পড়ো।
ওই বই পড়ো।
আর লেখালেখি !তার বয়স প্রায় চারদশক। লিখছি, চল্লিশ বছর ধরে। একটা অতৃপ্তি
তো থাকছেই। লেখা কি কিছু হচ্ছে ! যা চেয়েছিলাম- তা লিখতে পারছি কি !

বইনিউজ : সামনে বইমেলা। নতুন বই পাঠকরা পাবেন কি? আগামী কবিতা গ্রন্থ সম্পর্কে বলুন।
ফকির ইলিয়াস : আগামী বইমেলায় আমার তিনটি বই প্রকাশ হতে পারে বলে আশা করছি। ২০১৭ এর বইমেলায় এপর্যন্ত আমার দুটো বই কনফার্ম করেছেন প্রকাশকেরা।
‘বেহুলা বাংলা’ থেকে বের হবে আমার একটি উপন্যাস ‘মেঘাহত চন্দ্রের প্রকার’। এই প্রকাশনীর একটি সিরিজ আছে ৭১ এর ৭১ উপন্যাস। কিছু বই গত বইমেলায়
বেরিয়েছে। বাকীগুলো আগামী বইমেলায় বের হবে বলে প্রকাশক জানিয়েছেন। আমার রাজনৈতিক কলামের একটি বই-‘মুক্তিযুদ্ধের মানচিত্র ও স্বাধীনতার
উত্তরাধিকার’। আমি বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে কলাম লিখি প্রায় তিরিশ বছর যাবৎ। তা থেকে নির্বাচিত ৩০টি প্রবন্ধ নিয়ে বইটি প্রকাশ করছে- অনিন্দ্য প্রকাশ।
আমার ‘কবিতা সংগ্রহ’ নামে একটি নতুন বইয়ের পাণ্ডুলিপি জমা দেয়া আছে। এখনও কোনো কনফার্মেশন পাইনি। তাই কিছুই বলতে পারছি না।

বইনিউজ : নিজের বই ও লেখালেখিতে কতটা আনন্দ-বেদনা কাজ করে নিজের ভেতরে বিস্তারিত বলবেন কী?
ফকির ইলিয়াস :  দেখুন, যে কথাটি না বললেই নয়- তা হলো আমি বিদেশে থাকি। জন্মমাটিতে পা না থাকলে যে কোনও লেখককেরই পদযুগল শক্ত থাকে না। যেমন আমি চাইলেও
ঢাকার একুশে বইমেলায় যেতে পারি না, না না কারণে। বিষয়টি আমার কাছে বেদনার। একজন লেখক হিসেবে আমি সারাবছর ধরে কম-বেশি লিখি। প্রায় প্রতি
সপ্তাহেই ঢাকায় আমার কোনও না কোনও লেখা প্রকাশিত হয়। ঢাকার কথা এজন্য বললাম, কারণ ঢাকাকেই আমি বাংলা ভাষার মূল চারণভূমি মনে করি। আমার লক্ষ্য
থাকে, একুশে বইমেলায় আমার একটি বই বের হোক। সেই আনন্দ নিয়ে অপেক্ষায়
থাকি পুরো বছর জুড়ে।

বইনিউজ : বছর জুড়ে কেমন সব কবিতা লিখলেন?
ফকির ইলিয়াস : আমাকে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়, তা হলো সমসাময়িক মানবিক
সংকট। লক্ষ্য করবেন, ২০১৬ সাল পুরো বছরটিই গোটা বিশ্ববাসী শংকা ও হতাশার
মধ্য দিয়েই পার করেছেন। ঢাকার হলি আর্টিজান হত্যাকাণ্ড কিংবা সদ্য পাশ করা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর অসংলগ্ন,অযৌক্তিক কথাবার্তা-আচরণ মানুষকে
শংকিত করেছে খুব বেশি। জঙ্গীবাদের মতো কালো অজগর ছোবল দিয়েছে বিশ্বের
যত্রতত্র। দুর্নীতি-লুট-খুন-ধর্ষণ মানবসমাজকে কাঁপিয়ে দিয়েছে।
আমার কবিতায় সেসব বিষয় এসেছে খুব স্পষ্টভাবে। আমি মানুষের পক্ষে সাহস নিয়ে, প্রজন্মের পক্ষে সত্যের শক্তি নিয়ে দাঁড়িয়েছি আমার কবিতায়।

বইনিউজ : সারা বছর কী কী বই পড়লেন? কেমন লাগলো? ভালোলাগাটা আমাদের সঙ্গে শেয়ার করলে জানতে পারব।
ফকির ইলিয়াস :  আমি একটি কাজে বিশ্বাস করি খুব শক্তভাবে। তা হলো পুনর্পাঠ। আগে পড়া বই নতুন করে আবার পড়া। এরকম বেশ কিছু বই এবছর পড়েছি। কারণ
আমি মনে করি, একজন পাঠক বিশ বছর আগে একটি বই পড়ে যে ধারণা পেয়েছিলেন- বিশ বছর পর নতুন করে পড়লে তার ধারণা অন্যরকম হতে পারে।
আমি আবদুল মান্নান সৈয়দ, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, রাহাত খান, শক্তি চট্টপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়- এমন বেশকিছু লেখকের বই পুনরায় পড়েছি। পড়েছি
রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধেরও বেশ কয়েকটি।
পড়েছি আমেরিকান কবি রিটা ডোভ এর সম্পাদনায়,’ দ্যা পেঙ্গুইন এন্থলোজি অব
টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি আমেরিকান পোয়েট্রি’, পড়েছি জন এ্যশবেরি’র-‘ব্রিজিওয়ে’।

বইনিউজ : আপনার কবিতা ওপর কোনও কবির প্রভাব থাকলে তা নিয়ে আপনার নিজের মধ্যে বোঝাপড়া বলুন।
ফকির ইলিয়াস :  আমি আমার মতো করে কবিতা লিখি। আমি চাইনা, কারও প্রভাব আমার
কবিতায় কোনোভাবেই পড়ুক। আমি আমার পদছাপ রেখে যেতে চাই। তাই আমি
আমার নিজস্ব পথ তৈরির জন্যই শ্রম দিয়ে যাই।

বইনিউজ :  লেখালেখি নিয়ে আপনার চিন্তাটা জানাবেন? কীভাবে, কেমন লিখতে চান?
ফকির ইলিয়াস :  আমি মূলত কবিতা নিয়েই থাকতে চাই। আমার লেখা শুরু হয়েছিল
বাউল গান দিয়ে। ‘বাউলের আর্তনাদ'(১৯৮৫) আমার প্রথম বই। এখনও গান লিখি। তা দিয়ে সমগ্র করার ইচ্ছে আছে। ইচ্ছে আছে ভালো কয়েকটি গল্পও লিখে যাওয়ার।

বইনিউজ : বই পড়া ও কবিতা লেখা নিয়ে পাঠক ও নতুন প্রজন্মের কবিদের প্রতি আপনার  কোন পরামর্শ?
ফকির ইলিয়াস : পড়ালেখার এখন প্রধান অন্তরায় সোশ্যাল মিডিয়া। অনেকেই লিখতে এসে
শর্টকাট চাইছে। ফেসবুকে কবিতা নামের কিছু লিখে বন্ধুদের কাছে ইনবক্সে ‘লাইক’
চাইছে। মন্তব্য চাইছে। এগুলো খুবই অপমানজনক বিষয় একজন নবীন লেখক/লেখিকার জন্য। কেউ ফেসবুকে হাঁচি-কাশি দিলেই তিন-চারশ’ লাইক/কমেন্ট
পড়তে আমরা দেখি। এগুলো কি সাহিত্যের কোনো কাজে আসছে ?
না- আসছে না। লেখালেখি, ধ্যানী আরাধনা। সেই কাজটি অনেকেই করতে নারাজ।
কেন নারাজ ? কারণ তারা রাতারাতি লেখক হতে চান। এভাবে লেখক হওয়া যায় কি ?
কোনো কোনো বেকুব আছে, ওরা বলে- ‘লিখতে থাকুন। লিখতে লিখতে লেখা বেরিয়ে
আসবে, আর আপনি লেখক হয়ে যাবেন।’
ইতিহাসের ধারাবাহিকতা সেই সাক্ষী দেয় না। আমি ইউরোপ-আমেরিকায় দেখেছি
নবীন লেখকরা পাবলিক লাইব্রেরিতে তাদের সপ্তাহের অনেক সময় কাটান। তারা পড়েন। নিরীক্ষণ করেন। বিশ্বসাহিত্য মিলিয়ে দেখেন।
বাংলাদেশের আজকের তরুণ লেখক প্রজন্ম খুব বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। একে
অন্যের পিঠ চাপড়াচ্ছে, শুধুমাত্র বন্ধুজন বলে। অন্যদিকে প্রবীণ মেধাবীরা, তরুণ মেধাবীদের স্বীকৃতি দিচ্ছেন না। এই দূরত্ব কমিয়ে আনতে হবে উভয়পক্ষকেই।
তবে আমি বিশ্বাস করি, ভালো লেখা তার যোগ্য আসন পাবেই। লেখকও পাবেন
তার সামাজিক মর্যাদা।
 
বইনিউজ : বইমেলা, বই প্রকাশ, প্রকাশ মাধ্যম ইত্যাদি নিয়ে আপনার কোন কথা বলার থাকলে জানতে আগ্রহী।
ফকির ইলিয়াস : একুশে বইমেলা সকলের বইমেলা হোক। আমি একটা বিষয় খুব জরুরি মনে করি। প্রকাশরা বই প্রকাশ করে, বিক্রি করে বাণিজ্য করবেন। কিন্তু তারা লেখকের
পকেট থেকে টাকা নিয়ে ‘বাণিজ্য’ করবেন কেন ? ভালো বই হলে প্রকাশ করবেন-
না হয় করবেন না। যদি মনে করেন এই বই বিক্রি হবে, তবেই ছাপবেন। না হয়
ছাপবেন না।
আর হ্যাঁ- পাঠককেও ‘সৌজন্য কপি’ পাওয়ার মানসিকতা বাদ দিতে হবে। কিভাবে। কোথায় ফ্রি,অনলাইনে পাওয়া যায়- এই তদবির বাদ দিতে হবে।ফি দিয়ে বই এনে পড়ার জন্য পাবলিক লাইব্রেরীগুলোতো রয়েছেই। আমি মনে করি না, অনলাইনের এই
যৌবনকালে প্রিন্ট মিডিয়া ম্লান হয়ে যাবে। না- এমন সম্ভাবনা হলে ইউরোপ-আমেরিকার বড় বড় বইয়ের দোকান গুলো সংকটে পড়তো। এমন কিছু এখানে দেখছি
না।
হ্যাঁ- বাঙালী পাঠক কমছে। এই পাঠককে বইমুখো করাতে হবে।এজন্য লেখক-প্রকাশককেও ভাবতে হবে সিরিয়াসভাবে। #
@