Home / বই আলাপ / ছিল কবিতার শক্তি আর সাহস-গোলাম কিবরিয়া পিনু

ছিল কবিতার শক্তি আর সাহস-গোলাম কিবরিয়া পিনু

boimalaছিল কবিতার শক্তি আর সাহস-গোলাম কিবরিয়া পিনু

আসছে বইমেলা নিয়ে বইনিউজ প্রতিনিধির কথা হয় কবি গোলাম কিবরিয়া পিনু-এর সাথে।

 

বইনিউজ : কতদিন ধরে বই পড়া? কত দিন ধরে লেখা?
গোলাম কিবরিয়া পিনু : পাঠ্যবই পড়েছি শিশুকাল থেকে এম.এ এবং পিএইচ.ডি. করা পর্যন্ত। এর পাশাপাশি তো ৪৫ বছর ধরে পাঠ্য বইয়ের বাইরে নিয়মিত কত যে বই পড়লাম, তার তো হিসেব নেই! এখনো বই পড়ার কাজটি নিয়মিত। কিশোর-তরুণ-মধ্যবয়স পর্যন্ত গাইবান্ধা-রাজশাহী-ঢাকার লাইব্রেরিতে নিয়মিত সময় কাটিয়েছি, এখন তা আর হয় না। এমন কি ঢাকায় যে অফিসে দীর্ঘদিন চাকরি করতাম, সেই অফিসে একটা সমৃদ্ধ লাইব্রেরি ছিল, সেই লাইব্রেরিটিতে বহু ধরনের বই ছিল। বলা চলে লাইব্রেরি-বান্ধব পরিবেশ থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন থাকিনি। কিন্তু এখনো বই পাশেই থাকে, বই এখনো ঘনিষ্ট হয়ে সাহচর্য দিয়ে থাকে। বই ছাড়া প্রায় একদিনও চলে না! ঘুমানোর আগে বই পড়েই ঘুমাই, এ এক অভ্যেস। আমার লেখালেখি তো চলছে নিয়মিত তিন দশকের অধিক।

বইনিউজ : সামনে বইমেলা। নতুন বই পাঠকরা পাবেন কি? আগামী কবিতা গ্রন্থ সম্পর্কে বলুন।
গোলাম কিবরিয়া পিনু : নতুন বই পেতে পারেন পাঠকগণ। কবিতা ও প্রবন্ধের বই বের হতে পারে। আমার তো বেশ ক’টি কবিতার বই বের হয়েছে। প্রথম দিকের প্রকাশিত কবিতার বইগুলো বের হয়েছে বহু বছর আগে, তাই, কবিতা সংগ্রহ বের করার কাজ করছি, দেখি কী হয়।

বইনিউজ : নিজের বই ও লেখালেখিতে কতটা আনন্দ-বেদনা কাজ করে নিজের ভেতরে বিস্তারিত বলবেন কী?
গোলাম কিবরিয়া পিনু : আমিও বুঝেছি কিশোর বয়সেই- কবিতা লেখায় আমার ভবিতব্য। শুধু কবিতা লিখবো বা লেখালেখি করবো এটাই ছিল জীবনের মূল লক্ষ্য। কিশোর বয়সেই অন্ধকারের দিগন্ত চিড়ে বুঝতে পেরেছিলাম, অনেক পথই হাতছানি দিচ্ছে, কিন্তু সেইসব হাতছানি পরিহার করে কবিতার পথই থাকতে হবে আমাকে। এইতো এখন মাঝে মাঝে শুনতে হয় আমার জীবনসঙ্গীর কথা : ‘তুমি যদি কবিতা না লিখতে, তাহলে আরও বেশি বেতনের চাকরি করতে পারতে, টাকা-পয়সা হতো, গাড়ি-বাড়ি-ফ্লাট, আরও অনেক কিছু! না, তুমি এসবের দিকে তোমার যোগ্যতা থাকার পরও মনোযোগ দিলে না, সময় দিলে না!’ এক ধরনের হতাশা তার মধ্যে কাজ করে কি-না, জানি না। তবে, আমি মনে করি শুধু কবিতা লেখার জন্য দৃঢ় মনোবল নিয়ে জিদ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়েছে সেই কিশোর বয়স থেকেই। বহু কিছু ছাড় দিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে একাকী অনেক গলিপথ-ঘুরপথ ঘুরে-ফিরে নিজেকে কবিতার জন্য রক্ষা করতে হতে হয়েছে। কখনো কখনো উন্মাতাল সময়ের মুখোমুখি হয়েছি, কত রকমের মনস্তাত্বিক যুদ্ধ করতে হয়েছে কিশোর বয়স থেকে আজ অবধি। দর্শন-নৈতিকতার শিক্ষা অবলম্বন হিসেবে ছিল, ছিল কবিতার শক্তি আর সাহস।

লিখছি তিন দশকের অধিককাল। এর মধ্যে কবিতা-ছড়া-প্রবন্ধ ও গবেষণা মিলে ২৫টি বের হয়ে হয়েছে- বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিশু একাডেমিসহ বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে। কবিতা ছাপা হয়েছে অনেক। ছাপা হয়েছে সকল উল্লেখযোগ্য পত্রিকা-সাময়িকীতে এবং উল্লেখযোগ্য সম্পাদকের হাত দিয়েই। অনেক উল্লেখযোগ্য সংকলনেও আমার কবিতা গ্রহণ করা হয়েছে। এসবও একদিক থেকে অর্জন বলে আমি মনে করি। তবে, আরও ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বহুরৈখিকভাবে আমার অর্জন বা ব্যর্থতা কতটুকু- তা মূল্যায়ন করবেন পাঠক-সমালোচক ও অন্যান্যরা। তবে- নিজের প্রতি সমালোচনা রয়েছে ও বিচার-বিবেচনাও রয়েছে- তা এক ধরনের আত্মসমীক্ষাও বলা যেতে পারে। যত কবিতা লিখেছি- যা বিভিন্ন বিষয়ে ও বিভিন্ন নিরীক্ষাসমেত লিখেছি- তা সমালোচক ও অন্যান্যদের কাছে সেভাবে উপস্থিত বা তাঁদের চোখে পড়েনি, সে-কারণে সেভাবে মূল্যায়িত হইনি। এজন্য অপেক্ষা করা শুধু আমার ক্ষেত্রে নয়- সকল প্রকৃত কবিকেই অপেক্ষা করতে হয়। অপেক্ষার জন্য কঠিন নীরবতা সহ্য করা প্রকৃত কবির জন্য শ্রেয়। আমার ব্যর্থতা কী আর কতটুকু তা বিভিন্নভাবে নিজের কাছে মূল্যাযন করি। নিজের কড়া সমালোচক নিজের কাছে হতেই হয়। আমার অতৃপ্তি আছে- এখনো কুক্ষিগত কবিতা লিখতে পারিনি, তা লিখতে এখনো সচল আছি।

বইনিউজ : বছর জুড়ে কেমন সব কবিতা লিখলেন?
গোলাম কিবরিয়া পিনু : বছর জুড়ে নিয়মিত দৈনিক-মাসিক-সাময়িকী-লিটল ম্যাগাজিনসহ ইন্টারনেটভিত্তিক ম্যাগাজিনে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কবিতা লিখেছি। তবে, ধর্মান্ধ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বেশ ক’টি দীর্ঘ কবিতাও লিখেছি। লিখেছি সুন্দরবন নিয়েও, বাদ পড়েনি সাঁওতালদের অধিকার নিয়ে। আমি মনে করি কবিরা নিছক অক্ষরজীবী নন, তারা অরণ্যজীবী হয়ে সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারেন না। তারা সময়কালকে সংবেদনার মধ্যে দিয়ে মূর্ত করে তোলেন। বর্তমানকে চিরকালের ব্যঞ্জনায় অভিসিক্ত করেন। সমাজের মানসিকতা পরিবর্তনের ফলে কবিতার পরিবর্তন হয়, তবে কবিরা-সমাজের অগ্রসর মানুষ হিসেবে বিবেচিত হয় বলেই তারা পরিবর্তিত চেতনাকে কাঙ্খিত পর্যায় টেনে নিয়ে মানুষের চেতনাকে সমৃদ্ধ করেন বা নতুনভাবে মানুষের ভাবনা জগতকে নির্মাণ করেন বা মানুষের বোধকে ভিন্ন দ্যূতিতে উজ্জ্বল করেন।

বইনিউজ : সারা বছর কী কী বই পড়লেন? কেমন লাগল? ভালোলাগাটা আমাদের সঙ্গে শেয়ার করলে জানতে পারব।
গোলাম কিবরিয়া পিনু : ত্রিশ-চল্লিশটি কবিতার বই আছে, তা বছর ধরে বারবার পড়ি। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ের বাংলা কবিতা ও বিদেশি ভাষার কবিতা। এছাড়া নতুন কবিতার বই পড়ি, বিভিন্ন মাধ্যমে ছাপা কবিতাও পড়েছি। এছাড়া তো সমাজ-অর্থনীতি-রাজনীতি ও সাহিত্যবিষয়ক বই পড়েছি। ঈদ সংখ্যার ম্যাগাজিনসহ অন্যন্য সংকলন-বই থেকে উপন্যাস-ছোটগল্প পড়েছি। এসব লেখার বহু ধরনের উপাদান থেকে আমি আনন্দ পেয়েছি, অভিজ্ঞতা পেয়েছি, জ্ঞান পেয়েছি এবং পেয়েছি আরও বহুবিধ সংবেদ।

বইনিউজ : আপনা কবিতার ওপর কোনও কবির প্রভাব থাকলে তা নিয়ে আপনার নিজের মধ্যে বোঝাপড়া বলুন।

গোলাম কিবরিয়া পিনু : দেশে ও দেশের বাইরের অনেক কবি আমার প্রিয়। বাংলা কবিতা শুধু নয়, বিশ্বের অন্যান্য ভাষার কবিতাও ধারাবাহিকতা নিয়ে উজ্জ্বল হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা প্রবহমানেরই নামান্তর। এই প্রবহমান অবস্থানে থেকে আমার কবিতা নির্মিত হচ্ছে বলে আমি মনে করি। কবিতা শূন্যে বা হঠাৎ লাফ দিয়ে নির্মাণ করা যায় না। সূক্ষ্মভাবে অনেক কবি বিভিন্নভাবে একজন কবিকে প্রভাবিত করে থাকে, আমি তা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো গ্রহের কবি নই। যদি বলি- চর্যাপদ থেকে বাংলা কবিতার যে বিকাশ, সেই বিকাশের ধারায় সমকালীন বাংলা কবিতার অস্তিত্ব ও উজ্জ্বলতা। আর এই কারণে বাংলা কবিতার যে সম্ভাবনা তা অতীত থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। বাংলা কবিতার যে বৈশিষ্ট্য ও ব্যঞ্জনা রয়েছে, সেই প্রবহমান শক্তিকে ধারণ করেই সমকালীন বাংলা কবিতার সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করতে আমিও কবিতা লিখি।

বইনিউজ : লেখালেখি নিয়ে আপনার চিন্তাটা জানাবেন? কীভাবে, কেমন লিখতে চান?
গোলাম কিবরিয়া পিনু : লেখালেখি নিয়ে অনেক পরিকল্পনা ছিল, তা বাস্তবায়ন হয়ে ওঠেনি। ভবিষ্যতের কথা জানিনে, তবে কিছু চেষ্টা আছে, দেখি কী করা যায়। কবিতা আরও লিখবো ভিন্নভাবে লিখব, ভিন্ন বিষয় নিয়ে লিখব। কবিতার বাইরে প্রবন্ধ-গবেষণা ও ছড়ার বই আছে, অন্য আরও ভিন্নকিছু লেখার প্রেরণা আছে।

আশির দশকের কবি হিসাবে আমি চিহিৃত হলেও- এই দশকের কবি হিসেবে বিশেষ কী ধরনের বৈশিষ্ট্য উচ্চকিত কিংবা উজ্জ্বল; তা পাঠক সমালোচকগণ বিবেচনা করবেন বা করে থাকেন। তবে- আমি কবি হিসেবে বহু ধরনের কবিতা লিখেছি এবং সেগুলো বিভিন্ন নিরীক্ষাপ্রবণতায় সংশ্লিষ্ট বলে মনে করি। রাজনীতি সচেতনতা আমার কিছু কবিতায় থাকলেও তা কবিতার শিল্পশর্ত বা প্রাণ ক্ষুন্ন করেনি। সমকালীন কি-না তা জানিনে- তবে আমার কবিতায় জীবন আছে, সমাজ আছে, প্রকৃতি আছে, মানুষ আছে, দেশ-সময়কাল আছে এবং আছে প্রতীকের ব্যঞ্জনাও, আছে রূপক, আছে ছন্দের বিভিন্নমুখী ব্যবহার, অনুপ্রাসের নতুনমাত্রা, মিলবিন্যাসের নীরিক্ষা ও অন্যান্য সূক্ষ্ম কারুকাজ। একেক কাব্যগ্রন্থ একেক বৈশিষ্ট্য নিয়ে উজ্জ্বল বলে আমি মনে করি। প্রথম কবিতার বই ‘এখন সাইরেন বাজানোর সময়’ থেকে ‘সূর্য পুড়ে গেল’ কিংবা ‘কে কাকে পৌঁছে দেবে দিনাজপুরে’ কাব্যগ্রন্থের কবিতার বিষয়-আঙ্গিক ও বোধের জায়গা বদলিয়েছে, আবার ‘আমরা জোংরাখোটা’ কাব্যগ্রন্থ পেয়েছে ভিন্নমাত্রা। ‘সুধা সমুদ্র’ কাব্যগ্রন্থ লেখা হয়েছে মানুষের অন্তর্গত জীবন ও প্রবণতা নিয়ে, যেখানে প্রেম ভিন্নমাত্রা ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি নির্ভর হয়ে ধরা দিয়েছে। ‘ও বৃষ্টিধারা ও বারিপাত’ পুরো কাব্যগ্রন্থটি বর্ষা-বৃষ্টি-প্রকৃতির অনুসঙ্গ ভিন্ন আঙ্গিকে ও ছন্দে ভিন্ন ব্যঞ্জনা নিয়ে উপস্থিত। ২০১৪ সালে প্রকাশিত ‘উদরপূর্তিতে নদীও মরে যাচ্ছে’ কাব্যগ্রন্থটি পূর্বের কাব্যগ্রন্থগুলো থেকে পুরো আলাদা, ভিন্ন আঙ্গিক ও বিষয়-চেতনার ভিত্তিতে সচেতনভাবে লেখা হয়েছে। ‘ফুসলানো অন্ধকার’ নামের কাব্যগ্রন্থে রয়েছে বেশ ক’টি দীর্ঘ কবিতাসহ ভিন্নধারার কবিতা। উল্লিখিত কারণে বলবো- সচেতনভাবেই আমার কাব্য-পথচলা বিভিন্ন সময়ে বাঁক নিয়েছে- একরৈখিক থাকেনি-বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়েই সম্মুখবর্তী হয়েছে। আমার কাব্যের মানচিত্রটি হয়তো কারো চোখে পুরো দৃশ্যমান নয়, হয়তো কারো চোখে খণ্ডিতভাবে ধরা দিয়েছে, হয়তো কারো চোখে হঠাৎ এক দৃশ্য নিয়ে উপস্থিত হয়েছে- সেইসব কারণে সরলরৈখিকভাবে কেউ কেউ আমাকে টেনে নিয়ে কোনো এক ঘরে বসিয়ে এক ধরনের পোশাক পরিয়ে রাখতে চান- তা কতটুকু যুক্তিযুক্ত ভেবে দেখার বিষয়! একজন কবিতার পাঠক ও কবি হিসাবে আমার কবিতার প্রতি আমারও মূল্যায়ন রয়েছে- পর্যবেক্ষণ রয়েছে, ঠিক তেমনি অন্য কবি ও কবিতার প্রতিও। তুলনামূলক বিবেচনা আছে বলেই আমি জানি আমার কবিতা কোনখানে দাঁড়িয়ে আছে। আরও জানি আমার কবিতার নিজস্ব শক্তি কী? কতটা ব্যতিক্রম ও বহুবর্ণিল। তা হয়তো অনেকের পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েনি।
বইনিউজ : বই পড়া ও কবিতা লেখা নিয়ে পাঠক ও নতুন প্রজন্মের কবিদের প্রতি আপনার কোন পরামর্শ?
গোলাম কিবরিয়া পিনু : পরামর্শ নয়- বইয়ের কণ্ঠলগ্ন থাকা মানেই জীবনের বহুধা অবস্থান নিয়ে জীবনকে যেমন অনুভব করা যায়, তেমনি জীবনকে দেদীপ্যমান করা যায়। বই ছাড়া এইযুগে কারও চলে না এখন। তবে, বইয়ের সাহচর্য আনন্দায়কভাবে জীবনাচরণের সাথে সম্পর্কিত করলে ক্ষতি ব্যক্তি ও সমাজের তা বলা যায়।
নতুন কবিরা আরও বেশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সুযোগ-সুবিধার মধ্যে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছেন। তাই, চঞ্চল না হয়ে সকল প্রকৃত কবির মতই কঠিন নীরবতা সহ্য করে সৃজনশীল স্পর্ধায় এগিয়ে যাওয়ার প্রেষণায় মগ্ন থাকা শ্রেয়।

বইনিউজ : বইমেলা, বই প্রকাশ, প্রকাশ মাধ্যম ইত্যাদি নিয়ে আপনার কোন কথা বলার থাকলে জানতে আগ্রহী।
গোলাম কিবরিয়া পিনু : গত বছরে বাংলা একাডেমিতে সরকারি সংস্থা, শিশু-কিশোর বিষয়ক ও অন্যান্য বুক-স্টল রয়েছিল, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বেশিরভাগ বইয়ের স্টল, যারফলে মেলায় এক ধরনের বিচ্ছিন্ন ভূভাগ তৈরি হয়েছিল, অখণ্ড সত্তা নিয়ে মেলা দাঁড়াতে পারেনি। সকল বইয়ের স্টল এক জায়গায় রাখলে বরং ভালো হয়। মেলার সাংস্কৃতিক ও আলোচনা অনুষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে রাখলে চলে। মেলার পরিসর বাড়িয়ে আরও উন্মুক্ত এলাকা নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মেলা সম্প্রসারিত হতে পারে। বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের চেতনাগত দর্শন সাংঘর্ষিক নয়, বরং তা কাছাকাছি ও আমাদের জাতীয় চেতনার মূলখণ্ডরেই দেদীপ্যমান প্রতিভাস।
সৃজনশীল বইয়ের মার্কেট কুক্ষিগতভাবে গড়ে উঠছে না। তার বহুবিধ কারণ হয়তো আছে। আমার ব্যক্তিগত বিবেচনায় মনে হয়- প্রকাশনা শিল্পের এখনো অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। লেখক ও প্রকাশকের পেশাদারিত্বের বিষয়টি কুক্ষিগত পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার আরও সুযোগ রয়েছে। লেখকের পাণ্ডুলিপি গ্রহণ ও বিবেচনা করার ক্ষেত্রে অনেক প্রকাশকের আগ্রহ ও নিয়ম-নীতির অভাব রয়েছে । সম্মানি ও অন্যান্য দিকও বিবেচনা করা হয় না। প্রকাশকও বেড়েছে, লেখকও বেড়েছে কিন্তু উভয়ের মঙ্গলের জন্য আরও বোঝা-পড়ার গভীরতা বাড়ানো দরকার। আমাদের বইয়ের প্রকাশনার মানও বাড়ছে, লেখার মানও বাড়ছে, তা আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো প্রয়োজন। আধুনিক বিপণন-ব্যবস্থার প্রসার নিয়ে প্রকাশকদের অনেকের মধ্যে পরিপূরক উদ্যোগ ও সামর্থ্য নেই বলে মনে হয়। বই বিক্রির জন্য শুধু একুশের বইমেলার জন্য অপেক্ষা করে থাকেন অনেকে, অন্য সময়ে বই বিক্রির জন্য অনেকে হয়তো তৎপর থাকেন না। সৃজনশীল বই ঢাকার বাইরে বিপণন সঠিকভাবে পদ্ধতিতে করা হলে বই বিক্রি বাড়তো আরও। লেখা ও লেখকদের মর্যাদা বাড়ানোর সাথে সাথে সম্মানী ও অন্যান্য দিকসমূহের উন্নয়ণ ঘটানো দরকার। আমরা যদি সচেতন ও পর্যালোচনা করে উদ্যোগ নিতে পারি, তাহলে এই সকল সীমাবদ্ধতা কাটানো যাবে।