Home / বই আলাপ / বইপড়ার টুকরো স্মৃতি ১৪। ঘটনার পোড়ামাংশ থেকে হাড়ের বেদনায়

বইপড়ার টুকরো স্মৃতি ১৪। ঘটনার পোড়ামাংশ থেকে হাড়ের বেদনায়

Mostaque-Ahmedবইপড়ার টুকরো স্মৃতি ১৪। ঘটনার পোড়ামাংশ থেকে হাড়ের বেদনায়

আজ দুজন বই অন্তপ্রাণ কবির সাথে প্রথম সাক্ষাতের কথা বলব। প্রথম সাক্ষাতে দুজনকেই আমার ‘মেঘপুরাণ’ নামের কবিতার বইটি উপহার দিয়েছিলাম; তারাও আমাকে তাঁদের বই উপহার দিয়ে ছিলেন।
২০১০ সালে বিশ্বকাপের মৌসুমে বরিশাল সফর পড়েগেল। বরিশালে গিয়ে যোগাযোগ করলাম কবি হেনরি স্বপনের সাথে। কবি নাছোড়, বাসায় নিয়ে গেলেন, মানে ‘বাউলবাড়ি’তে। তাঁর চমৎকার লাইব্রেরীর সামনে বসেই মনটা ভালহয়ে গেল, সারা বাড়িতে শৈল্পিক ছোঁয়া। চানাশতা আসছে দেদারসে, আমরা গল্প করছি; হঠাত জানলাম কবির দুর্ঘটনার কথা। কয়েকদিন আগে রান্নার স্টোভ বিস্ফোরিত হয়ে কবি আহত হয়ে ছিলেন, পুড়ে গিয়েছিল মুখ। হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল; অসুস্থতার সময়ে যে কবিতা গুলো লিখেছিলেন তাদিয়েই প্রকাশকরে ফেললেন ‘ঘটনারপোড়ামাংশ’। আমাকে এক কপি বই উপহার দিলেন। নজিব তারেকের প্রচ্ছদ আর অলঙ্করন মনোলোভা। কবিও অসুস্থতার কারণে কিছুটা খোলশ ছেড়েই লিখেছেন বলে মনেহল। প্রথম কবিতা তেইমুখ পুড়ে যাবার কথা উঠেএসেছে- ‘ পোড়া মুখে কবিতা শোনাই-‘। পরবর্তীতে হেনরী স্বপন তাঁর শ্রেষ্ঠকবিতাও আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। তানিয়ে আলোচনার বদলে একটা কবিতাই লিখে ফেলেছিলাম –
তোমার বানানগুলো শিখতে বসা অবশেষে
কবিতার অযুত-নিযুত-বর্ষ দূরে, রাজকীয় চাপে
ঘিরে থাকে জীবনানন্দীয় অবসাদ, ক্লান্তি

তুমি বন্ধু লিখে যাচ্ছ গ্রন্থের পর গ্রন্থ
সময় কোথায় পংক্তিভোজের, কোথায় বা মন
তাৎক্ষণিকনীলাভপয়ারেরমোহ
হরণ করেছে মহাকাল
তার থেকে আরো কিছু নিল
দুঃখ ভারাক্রান্ত ইনবক্সের কলি
‘ফুটিতে চাহে’ ইথার-উনুনে অসুখী, ‘মায়ার ছলনা’য়

এসবের মাঝেও লিখে গেলে গ্রন্থের পর গ্রন্থ
আমি তোমার বানানগুলো শিখতে লেগেছি সবে
কীর্তনখোলার পাড়ে বসে কবির সাথে সাহিত্য আলোচনা আর জীবনানন্দের বাড়িতে একটা ঢুঁ মারা আমার বরিশাল সফরের অন্যতম আকর্ষণ।
সে বছরেই সিলেটে গিয়ে দেখা করলাম কবি মোস্তাক আহমাদ দীনের সাথে জিন্দাবাজারের ‘বইপত্র’ লাইব্রেরীতে। এটি একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরী, এখানে বই কিনতে এলে আর দশটা লাইব্রেরি খুঁজতে হয় না। কবি আমাকে তাঁর কবিতার বই ‘কথা ও হাড়ের বেদনা’ উপহার দিলেন, সাথে পেলাম কবিতা বিষয়ক কাগজ ‘মুনাজেরা’। কবির ‘জল ও শ্রীমতী’ আগেই পড়া ছিল।
‘কথা ও হাড়ের বেদনা’ তিন অংশে বিভক্ত- ডুবোপাহাড়ের ঘরবাড়ি, সময়খণ্ড আর হাড়লিপি। দীনের কবিতায় পেয়ে যাই হেনরি স্বপনের রান্নাঘর বৃত্তান্ত – “ তোমার রন্ধনপাত্রে আমাদের ঘোরগ্রস্ত দিন।“
মোস্তাক দীনের সূত্রেই পরিচয় হয় চৈতন্যের প্রকাশক রাজীব চৌধুরী আর সিলেটের তরুণ সাহিত্যকর্মীদের সাথে।
পরবর্তীতে আরো পড়েছি কবির ‘বাণপ্রস্থের আগে’ আর ‘ ভিখিরিও রাজস্থানে যায়।‘ কিন্তু কোনো বই নিয়েই আলোচনা করা হয়নি। বরং কয়েক ছত্র লিখেছিলাম ‘মুনাজেরা’ নিয়ে-
ষাটের দশকের শেষ দিকে অমরেন্দ্র চক্রবর্তী বের করতেন ‘কবিতা পরিচয়’। সেখানে একটি কবিতা নিয়ে একজন এ সংখ্যায় আলোচনা করতেন তো পরের সংখ্যাতেই তা নিয়ে প্রতি-আলোচনায় মশগুল হতেন আরেকজন । এইভাবে একটিমাত্র কবিতাকেন্দ্রিক আলোচনার একটা ধারা সৃষ্টি হয়। মুগ্ধ হয়ে দেখি, একাধিক আলোচকের আলোচনায় একটা কবিতার নানা পিঠে আলো পড়েছে । ১১ টি সংকলনে ২১ কবির ৪০ কবিতা নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোকপাত হয়েছে ‘কবিতা পরিচয়ে’। রবীন্দ্রনাথের ‘দুঃসময়’ নিয়ে ৫ জন, জীবনানন্দের ‘গোধুলিসন্ধির নৃত্য’ নিয়ে ৪ জন, সুধীন্দ্রনাথের ‘নষ্ট নীড় ; নিয়ে ৪ জন, অমিয় চক্রবর্তীর ‘বৃষ্টি’ নিয়ে ৪ জন আলোচনা করেছেন। কবিতার পূর্ণাঙ্গ আলোচনার এই ধারা পরের প্রজন্মের জন্যে বড় সম্পদ।
জীবনানন্দ দাশের কবিতার চাবিকাঠির সন্ধান করেছেন আকবর আলী খান। ‘বনলতা সেন’ কাব্য গ্রন্থের নাম কবিতাটি বিশদভাবে আলোচনা ছাড়াও গ্রন্থের অন্যান্য কবিতাগুলোর চাবিশব্দগুলো অনুসন্ধান করে আলোচনা করেছেন বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ধাঁচে। কবিতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কবিকে বাদ দিয়ে কখনও তা করা সম্ভব না- কবির জীবনের খুঁটিনাটি কবিতা রচনাকালের পাশে রেখে ব্যবচ্ছেদ করেছেন আকবর আলী খান। এই গ্রন্থ কবিতা অনুধ্যানের এক স্বতন্ত্র ধারা; ‘চাবিকাঠির সন্ধানে’ পড়ার আগ পর্যন্ত আমার বনলতা সেন পাঠ ছিল অসম্পূর্ণ।
‘ মুনাজেরা’র চারটিমাত্র সংখ্যা বের হয়েছে। কবিতাকেন্দ্রিক আলোচনা আছে, কবিতার বই আলোচনা আছে, কবিতা নিয়ে কবির নিজস্ব ভাবনা- ভাষ্য আছে, আছে পুনর্মুদ্রনের মাধ্যমে যৌথ পুনঃপাঠের আয়োজন। যারা গতানুগতিকতার বাইরে কাজ করেন, তাঁদের একটা প্রধান সমস্যা – ‘ভালো লেখা পাওয়া যায় না’। অতএব আরম্ভের ( ২০০৮) অর্ধযুগ পরে যুগপত মুনাজেরা তার ৪র্থ সংখ্যা (২০১৪) প্রকাশ করবে এবং কৃশকায় আদলটি কাটিয়ে উঠবে এটাই স্বাভাবিক।
প্রথম সংখ্যার ভূমিকায় ছিল, “ শুরুতেই আমরা যে একটি কবিতা নিয়ে আলোচনার জন্যে আহ্বান করেছি, তার কারণ – আমাদের মতে – আপাতত এটিই হলো কবি ও পাঠকের মধ্যেকার দূরত্বঘোচক / অন্তরঙ্গ পথ …”।
৪র্থ সংখ্যায় একটি কবিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে ৯টি- এ এক তুঙ্গস্পর্শী সমাহার; উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বিনয় মজুমদারের ‘তুমি পুনরায় চলে গেছ’ নিয়ে জফির সেতু। সুনীলের কম আলোচিত ‘বিবৃতি ‘ নিয়ে প্রশান্ত মৃধা , মোহাম্মদ রফিকের ‘কবিতা ৪’ নিয়ে সত্যজিৎসিংহ, আলোক সরকার আলোচনা করেছেন বিষ্ণু দের ‘এ মৃত্যু সংবাদ’। নিজের কবিতার মুহূর্ত নিয়ে অন্তরঙ্গ আলোকপাত করেছেন মৃদুল দাশগুপ্ত। এই বিভাগেই কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেন নিজের দুটি কবিতা নিয়ে কথা বলে গেছেন। এ ছাড়াও আছে কবিতার কথা, বই এর কথা, গানের কথা, তরজমা।
‘মুনাজেরা’ তার প্রথম সংখ্যা থেকেই পরিণত , কিন্তু ৪র্থ সংখ্যায় এসে মনে হল কবিতার আলোচনাকেন্দ্রিক একটা টোটাল কাগজ হিসেবে মোস্তাক আহমাদ দীনের ‘মুনাজেরা’, অমরেন্দ্র চক্রবর্তীর ‘কবিতা পরিচয়ে’র মতোই স্মরণীয় হয়ে থাকবার মত কাজ করছে। ‘মুনাজেরা’ নিয়মিত হউক, দীর্ঘজীবি হউক!