Home / বই আলাপ / তুমি রবে নিরবে: এহসানুল আলম খোকন

তুমি রবে নিরবে: এহসানুল আলম খোকন

Dipongker-Goutam

তুমি রবে নিরবে: এহসানুল আলম খোকন
সম্পাদক : দীপংকর গৌতম
প্রকাশক: শ্রাবণ প্রকাশনী
মূল্য: ৫০০ টাকা
সম্পাদকের কথা

১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন তো বটেই গোটা পৃথিবীর শিল্প-সংস্কৃতির আন্দোলনে এক নবজাগরনের অবস্থা পরিলক্ষিত হয়। বিপ্লব যেন তুলি কলমে জুড়ে দেয় নতুন ভাষা, নতুন রেখা। একটা দেশের শাসক- শ্রেণীর দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে শোষিতের মুক্তি সংগ্রাম সফল হলে সে দেশের শিল্প- সংস্কৃতিতে তার প্রথম পরিবর্তনের ধাক্কা লাগে। কারণ লেখক-শিল্পীর দ্রোহ ছাড়া গণমুক্তি সহজ হয়না। তাছাড়া মেহনতি মানুষকে বাদ দিয়ে যে বুর্জোয়া শিল্প বিরাজ করে তার আবেদন থাকে না। ইতিহাস পরিবর্তনের নায়ক গণমানুষ। তাই শিল্প সংস্কৃতিতে তার ছোঁয়া থাকতেই হয়। একথার ধারাবাহিকতায় দেখি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনে আসে নতুন অভিঘাত। প্রতিকূল অবস্থা শিল্পী-চেতনায় সময়, সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা তৈরি করে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুশাসনের মধ্যে অবস্থান করে যেহেতু স্বাধীন চিন্তার বা অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যায় না, তাই চল্লিশের দশকের শেষে গড়ে ওঠে ‘ঢাকা আর্ট গ্রুপ’। এই গ্রুপের না হয়েও চিত্রকলার নিরীক্ষাধর্মী কাজের ভিন্ন এক দিকবলয় সৃষ্টি করেছিলেন শিল্পী এহসানুল আলম খোকন। খুবই নিভৃতচারী এই শিল্পীর কাজ দেখলে বিস্মিত হতেই হয়। ফিগারেটিভ নন ফিগারেটিভ দু’ধরনের কাজই আছে তার। এর মধ্যে রঙে রূপে রসে আছে নিরীক্ষা। কি দারুণ ফিগারেটিভ কাজের মধ্যেও আছে রঙের খেলা। কবি সুকান্তের ‘দেয়ালে দেয়ালে মনের খেয়ালে শব্দ সাজানোর মতো তিনি তুলি দিয়ে ফ্রেম ও প্রচল ধারার বাইরে দাঁড়িয়ে ছবি এঁকেছেন, নির্মাণ করেছেন প্রাতস্বিক ধারার। তার কঙ্কালসার মানুষের জীবনধারার যে দর্শন মেলে সেটা এস.এম সুলতানের চিত্রধারার উল্টো পিঠ। সুলতান তার ফিগারেটিভ চিত্রকলার ব্যাখ্যায় বলেছিলেন- বাঙলার কৃষক দেখতে হাবা-গোবা ও স্বাস্থ্যহীন হলেও তার মধ্যে আছে বিশাল দেহের এক শক্তিবান মানুষ। নতুবা আজকের যুগে যন্ত্র ব্যবহার না করে লাঙল দিয়ে আদিম কায়দায় মাটির বক্ষ চিরে তারা সোনার ফসল ফলায় কী করে? সত্যি সুলতানের এ ব্যাখ্যার উত্তর নেই। অসাধারণ বক্তব্য-তবে রূপক। সে ক্ষেত্রে শিল্পী এহসানুল আলমের ছবির বক্তব্য দাঁড়ায়-যা দৃশ্যমান তাই বিষয়বস্তু। তার ছবির কাহিনী অনেক। তবে এটাও ঠিক যে তিনি বাংলার যত দুর্ভিক্ষ দুর্দিন মানুষের আকাল প্রত্যক্ষ করেছেন তার ছবিতে তাই কঙ্কালসার মানুষের প্রতিবিম্ব প্রতীয়মান। কঙ্কালসার জীবনের মধ্যে তার শিল্প আশা জাগানিয়া, দেখা যায় আল্পনা সদৃশ জীবনের নান্দনিক চর্চা। পাথরের ওপরে ফোঁটা ফুলের মতো। ভ্যান গঘের হলুদ রঙের প্রীতি তারও ছিলো তবে লাল রঙের প্রতিও তাঁর ভালোবাসাকে উড়িয়ে দেয়া যাবে না। এক্ষেত্রে তাঁর বন্ধু রাজনীতিক হায়দার আকবর খান রনো ভূমিকার মধ্যে লিখেছেন, তার পারিবারিক পরিমণ্ডলে ও আন্দোলন সংগ্রামের সঙ্গে তাঁর যুথবদ্ধতার কথা। সে ক্ষেত্রে বোঝা যায়, জীবনের কোথাও তিনি ফাঁকি দেননি। যা বিশ্বাস করেছেন তাই, লালন করেছেন ও এঁকেছেন। কয়েকটা ছবিতে (ছবির শিরোনাম নেই বলে উল্লেখ করা গেল না) বিশ্বখ্যাত শিল্পী মাতিসের প্রভাব বা ওয়েস্টার্ন চিত্রকলার প্রভাব লক্ষ করা গেলেও তার ছবি অধিকাংশই রিয়েলেস্টিক এবং জটিলতা পেরিয়ে এক সরল সত্যেও অনুসন্ধানরত।
এক্ষেত্রে মঈনুদ্দীন খালেদের কয়েকটি কথা প্রণিধানযোগ্য- “একটি মানুষ যখন একটি রেখা টানে তুলি বা কাঠির মাথায় রং লাগিয়ে অথবা পুঁইগোটা বা অন্য কোনো বর্ণ উপাদান আঙুলের ডগায় লাগিয়ে মাটিতে বা দেয়ালে টানে রেখা, তখনই তাতে বিদ্যুতের মতো প্রবাহিত হয়ে যায় তার চেতনা। মানে সেই মানুষের মন। মনন ভাবনা। সেই নন্দনতত্ত্ব একটি মানুষের নয় আর। একটি জাতির। একটি বিশাল ভূখন্ডের জল হাওয়ায় লালন-পালনে সমৃদ্ধ সেই মন।

এমন কথা বললে আমরা বুঝতে পারি কার সঙ্গে সম্পর্ক সিন্ধু সভ্যতার, কে কথা বলছে দূর ক্রিটের সভ্যতার সঙ্গে। কার দেশ বঙ্গোপসাগরের জল ধুয়ে দেয় আর কাকে স্নিগ্ধ করেছে ভূমধ্যসাগরের জল।” বাংলার চিত্রকলার ইতিহাস সুপ্রাচীন। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে বাংলার চিত্রকলার ইতিহাস পাওয়া যায়। প্রাচীন শহর উত্তরবঙ্গের পুন্ডবর্ধনে চিত্রিত একটি চিত্রকর্মই সে সময়ের চিত্রকলার এক অন্যতম নিদর্শন। এ চিত্রকর্মটির তথ্য পাওয়া যায় বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ দিব্যাবদান-এর ‘বীতাশোকাবদান’ খন্ডের একটি কাহিনী থেকে। এ চিত্রকর্মে পরিলক্ষিত হয়, গৌতম বুদ্ধ নিগ্রন্থকে (গোসাল) শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন। তাছাড়া ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সম্রাট অশোকের শাসনকালেও বাংলায় চিত্রকলার প্রচলন ছিল। যত দূর অনুমান করা হয়, বাংলার চিত্রকলার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে পালযুগে। তৎকালে রাজ-পৃষ্ঠপোষকতায় শিল্পকলার বিস্তৃতি লাভ করে। অপর এক তথ্যমতে, বাংলাদেশের চিত্রকলার সূত্র-সন্ধান পাওয়া যায় ৭২৩ খ্রিস্টাব্দে পর্যটক হিউ-এন-সাংয়ের রচিত বই থেকে। এ ছাড়া দশম শতকের দিকেও চিত্রকলার অস্তিত্ব ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। ধারণা করা হয় সে সময় ক্যানভাস ও দেয়ালচিত্রের প্রচলন ছিল। যদিও ক্যানভাস ও দেয়ালচিত্রের ঐতিহ্যগত রীতির প্রচলন সম্পর্কে তেমন কোনো প্রামাণ্য দলিল নেই। তবে অষ্টম শতক থেকে বারো শতকের পাল রাজাদের শাসন আমলের বেশ কিছু চিত্রকলার নিদর্শন পাওয়া যায়, যা ব্যাখ্যামূলক চিত্র বা নকশা হিসেবে আখ্যায়িত হয়। এ সকল চিত্রকর্ম বাঙালি শিল্পীদের নয় বলেও ধারণা করা হয়। কিছু কৌশলগত তফাৎ ছাড়া বাংলার চিত্রকলার সঙ্গে নেপাল বা বিহারের চিত্রকলার তেমন কোনো পার্থক্য নেই বললেই চলে। এ ক্ষেত্রে বাংলা, বিহার বা নেপালের চিত্রকলার শৈলী নিয়ে আলোচনা হতে পারে। বিষয়বস্তুর পাঠক্রম অন্তর্ভুক্ত করেছে প্রজ্ঞাপারমিতাকে। আর তা হলো, মহীপালদের পঞ্চম ও ষষ্ঠ বর্ষ (১০৭১ খ্রিস্টাব্দ) থেকে রায় পালের ঊনচলি­শতম বর্ষ ও হরিভার্মার শাসনকাল। ধারণা করা হয়, ১০১৫ শতকে পাল শাসনামলে গোপালদেব তৃতীয়-এর চতুর্দশ বছরের এবং গোবিন্দ-পালের চতুর্থ বছরের কোনো এক সময়ে উদ্ধারকৃত কাঠের তৈরি শিবলিঙ্গ অঙ্কিত এবং লিখিত হয়েছে। অপর একটি শিবলিঙ্গ আঁকা ও লেখা হয়েছে কাগজে। এ ছাড়া আরও কিছু নিদর্শন পাওয়া যায় ধাতু নির্মিত বস্তুতে, যার অধিকাংশই বৌদ্ধ দেব-দেবীর প্রতিমূর্তি। এ সকল চিত্র ছিল লেখাসংবলিত। প্রথাগত অঙ্কন পদ্ধতি অনুসরণ করে এগুলো চিত্রিত হয়নি। মূলত দেয়ালচিত্রের রীতি অনুসৃত হয়েছে এ সকল চিত্রকর্মে।
এসব আলোচনার ধারাবাহিকতায় এহসানুল আলমের কথা আবার নিয়ে আসছি। পঞ্চাশের দশক থেকে সংগ্রাম করে আসা এই শিল্পীর ছবি কি কেবলই ছবি? একজন চিত্রশিল্পী কি কেবলই রং-তুলি নিয়ে ক্যানভাসের পর ক্যানভাস ছবি এঁকে যান? নাকি তার সংগ্রাম চলে নিরন্তর। গণমানুষের মুক্তির সংগ্রামে তাঁর তুলি হয়ে ওঠে ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী। সমাজের প্রতি, দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা যেসব শিল্পীর মধ্যে প্রকট, এহসানুল আলম তাদেরই একজন। চিরকুমার এই শিল্পী জীবদ্দশায়ই ছিলেন প্রচারবিমুখ। ফলে তার ছবি এতকাল কারো চোখেই পড়েনি। তাঁর বোনেদের প্রচেষ্টায় এ ছবি প্রথম আলোচনায় এলো। তাঁর অ্যালবাম প্রকাশের মধ্য দিয়ে তা বিস্তৃত হবে