Home / বই আলাপ / আমাদের বাতিঘর:সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী-আলমগীর স্বপন

আমাদের বাতিঘর:সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী-আলমগীর স্বপন

s3

সাংবাদিকতার সুত্রেই স্যারের সাথে পরিচয়।বইয়ের মানুষটির কাছে যাওয়া।প্রথম যেদিন স্যারের সাক্ষাতকার নিতে ফোন করেছি এখনও মনে আছে অনেকটা ভয়ে ভয়েই মোবাইলের বাটনে হাত পড়েছে আমার। তবে ওপাশের মানুষটির কণ্ঠ শুনে সব ভয় উবে গেছে। ভরাট গলায় ধানমন্ডির বাসার ঠিকানা দিয়ে বলেছেন,‘সময়মতো চলে এসো।’এখনও মনে আছে,তিন তলা সিড়ি ভেঙ্গে কলিংবেল টিপতেই স্যার দরজা খুলে দিলেন।ভেতরে ঢুকে খালি বই আর বই।কোন দিকে তাকাই। অন্যদের সাথে এখানেই যেন পার্থক্য স্যারের। এর আগে অনেকের সাক্ষাতকার নিয়েছি বিদ্যায় বুদ্ধিতে যাদের নামডাক,তাদের ড্রয়িংরুম ভর্তি আভিজাত্যের ছাপ দেখেছি। দেখেছি দেশ বিদেশের নানা কারুকাজের শোপিস-অ্যান্টিকস। এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু স্যারের রুমে শুধু বই। হ্যাঁ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সারাজীবন বইকেই ধ্যানজ্ঞান মেনেছেন। যত বই লিখেছেন এর চেয়ে ঢের বেশি পড়েছেন,পড়ছেন এবং লিখছেন। তবে স্যার কত বই লিখেছেন তা না বলে স্যার কি লিখেছেন,লিখছেন এটাই বিবেচ্য।
বইয়ের কথা বলতে গিয়ে আসা যাক বইয়ের জগত বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে। কেন্দ্রের লাইব্রেরীর সদস্য হয়েছি বছর দু’য়েক।একের পর এক বই তুলছি,পড়ছি।এরকমই এক দিন একটা বই তুলে লাইব্রেরিয়ানের কাছে দিয়েছি আমার নামে লিখে রাখতে।বইটি দেখেই লাইব্রেরিয়ান আমার দিকে তাকালেন। বললেন,‘বইটা ভালোভাবে পড়বেন।’এর আগে কোনদিন তিনি এমন মন্তব্য করেননি। বই দিয়েছি চুপচাপ কার্ডে নাম লিখে দিয়ে দিয়েছেন। যে বই নিয়ে এতো সাতপাচঁ এতোক্ষনে তার নামই বলা হয়নি। ‘লেনিন কেন জরুরী’। ১৯৯৩ সালে বইমেলায় প্রথম প্রকাশ। যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতন্ত্রের পতনের উৎসবে পুজিঁবাদিরা,যখন এদেশের বাঘা বাঘা বুদ্ধিজীবী-কমিউনিস্টরা নিজেদের মার্কসিস্ট পরিচয় লুকানোয় ব্যস্ত তখন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলছেন,লেনিনের জরুরতের কথা। সেই সময়েও গণমানুষের মুক্তির প্রশ্নে সমাজতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তার কথা বলতে তাঁর কোন রাখঢাক নেই।কেননা নির্মোহ এই মানুষটি জোয়ারে গা ভাসাতে চাননি। মার্কসবাদের পক্ষে কথা বলছেন,মানুষের মুক্তির চিন্তায়। সুবিধা বুঝে তিনি কখনও কথা বলেননি কিংবা সুবিধা বুঝে সুবিধা নেননি ক্ষমতা কাঠামো থেকে। এরকম মানুষই তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্যানেলে নির্বাচনে সব্বোর্চ ভোট পেয়েও উপাচার্য পদ গ্রহন করেনা।সরকারের আহŸান সত্বেও এক্ষেত্রে নিজের মতাদর্শিক অবস্থানে অটল ছিলেন।স্মৃতিচারণে তিনি বলছেন,‘যখন উপাচার্য হওয়ার সুযোগ এলো তখন আমার সিদ্ধান্তটা ভেতর থেকেই এলো,আমি এই কাজ পারবো না। আবার তখন সামরিক শাসন ছিলো। এরশাদ ছিলো। তখন সামরিক শাসনের সাথে আমার যে সহযোগিতা করা বা যেভাবে করতে হবে সেটা আমার পক্ষে করা সম্ভব হবে না। আর দ্বিতীয় কথা হলো উপাচার্যের কাজ সেটা জটিল হয়ে গেছে। সেজন্য আমার যে স্বাভাবিক কাজ শিক্ষকতা সেটাকেই আমি রক্ষা করলাম।’
কেন শিক্ষকতাকে ধ্যানজ্ঞান বলছেন,কেনইবা শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ? যেখানে তার বাবার আগ্রহ ছিলো ‘ছেলে আমলা হবে’। এর মাজেজা স্যারের মুখেই শোনা যাক,‘ এখানে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) আমার যারা শিক্ষক ছিলেন তাদের সান্নিধ্য পাবো আবার ছাত্রদেরও সান্নিধ্য পাবো।এর মধ্যে দিয়ে আমি দুই দিক থেকে বিকশিত হবো।একবার তারুণ্যের দিকে একবার জ্ঞানের দিক থেকে।’
জ্ঞান ও তারুণ্য স্যারের চীর আরাধ্য। তরুনদের মাঝে অধিত জ্ঞান ছড়িয়ে দিয়ে তিঁনি সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেন।তাইতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের ছোট রুমটিকে শুধু নিজের মাঝে বদ্ধ করে রাখেননি।একে তারুণ্যের ক্ষেত্র হিসেবে গড়েছেন।তিনি এখানে শুধু বলেন না, বেশি করে শোনেন।তরুনদের প্রশ্ন করতে উদ্ধুদ্ধ করেন। নানা তর্কে বিতর্কে এর মাঝ দিয়ে জানতে চান,বোঝাতে চান মানুষের কথা। আর সেই মানুষের মুক্তি কিসে ? কোন তন্ত্রে ? কৃষকের কাছে মেহনতী মানুষের কাছে কেন যেতে হবে,সাংস্কৃতিক আন্দোলন কেন জরুরী ?-এসব প্রশ্নের উত্তর ও করনীয় বাতলাতে তিনি পিছপা হননা। বিশ্ব-দেশ-দেশের আর্থ সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থায় যে, আমাদের চুপ করে বসে থাকতে নেই এ বিষয়ে তিনি একাই বলে যাচ্ছেন। অন্যরা যখন চুপ ছিলেন ওসমানী উদ্যানের গাছ রক্ষার আন্দোলন তিনি এগিয়েছেন অনেক বাধা অতিক্রম করেই।সাম্প্রতিক তনু হত্যায় যখন বিদ্বানদের অনেকেই নিশ্চুপ,বিচারহীনতার সংস্কৃতি,লুটপাট দুর্নীতির বিরুদ্ধে যখন কারো উচ্চবাচ্য কম তখন সিরাজ স্যার দেখিয়ে দিচ্ছেন ‘রাষ্ট্রের ব্যাধিটা কোথায়’। তিনি বলছেন, ‘রাজপুত্র হ্যামলেটে’র মতো এখানে ‘রাজা’ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।আবার বিচ্ছিন্নতার কারনে ধর্মের দিকে ঝোক বাড়ছে। তিনি বলছেন,‘আমরা যে ব্যবস্থায় আছি,সেটা হ্যামলেটের ডেনমার্কের মতোই অন্যায় ব্যবস্থা।এখানে ন্যায় পর্যুদস্ত হচ্ছে। সুবিচার নেই।শোষন-নিপীড়ন চলছে।এখানে আজ কোনো প্রকার নিরাপত্তা নেই। আমরা যদি এই ব্যবস্থাটাকে বদলাতে চাই তাহলে একা কেউ পারব না।সংঘবদ্ধ হতে হবে এবং যেখানে সংগঠনের প্রয়োজন।’
এই বিরুদ্ধ সময়ে তাঁর মতো করে কেউ কি বলছেন এমন কথা? কেউ কি এমন নির্মোহ ? ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, জন মানুষের আকাঙ্খাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায় আমাদের চিন্তাবিদ-বিদ্বান ব্যাক্তিদের কতজনের আছে ? কতজন এমন প্রশ্ন তুলছেন ? বেশিরভাগই কি দলীয় বলয়ে,স্বার্থের কাছে বাধা পড়েননি?এক্ষেত্রে স্মরন করা যেতে ফিলিস্তিনের প্রয়াত বুদ্ধিজীবী এডওয়ার্ড ডবিøউ সাঈদকে।তাঁর মতে, ‘বুদ্ধিজীবীর দায়িত্বই হলো প্রশ্ন তোলা।রক্ষণশীলতা,কর্তৃত্ব ও অন্ধবিশ্বাস মোকাবিলা করা। তাঁর মধ্যে এমন বোধ কাজ করবে যে, সরকার বা কর্পোরেশন কর্তৃক করায়ত্ত হওয়ার মতো কেউ নন তিঁনি।তিঁনি প্রতিনিধিত্ব করবেন জনমানুষের’। ফরাসী চিন্তাবিদ মিশেল ফুকোও বলছেন,‘ বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা পরিচালিত হবে ক্ষমতার বিরুদ্ধে, সকল ধরনের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে।’
এখানেই অনন্য একজন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।অন্যরা যখন ‘বিদ্যার ভুড়ি ভুড়ি’ কাটেন তখন তিঁনি জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেন। বৈষম্য-অসাম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলেন। ভারতীয় বাঙ্গালী বুদ্ধিজীবী বিনয় ঘোষ এক্ষেত্রে মোক্ষম কথা বলেছেন,‘মহাবিদ্বান কেউ যদি অগাধ জ্ঞানসমুদ্রে ডুব দিয়ে তলিয়ে থাকেন এবং কেবল ভুড়ভুড়ি কাটেন,যদি তাঁকে দেখা না যায়,তাঁর চিন্তাভাবনায় কথা জানা না যায় তাহলে তিনি জ্ঞানতপস্বী স্কলার হলেও, সামাজিক অর্থে ইন্টেলেকচ্যুয়াল নন।’
৮০ তম জন্মদিনে সিরাজুল ইসলাম স্যারকে পাঠ করতে চাই তাঁর কথা দিয়েই।‘লেনিন কেন জরুরী’ বইয়ে স্যার কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা লিখতে গিয়ে বলছেন,‘ বড় বলেই রবীন্দ্রনাথ আমাদের ছোট ছোট জীবনে থাকেন।হৃদয়ের দরজা দিয়ে প্রবেশ করা সহজ,বুদ্ধির দরজা বরং সে তুলনায় দুর্গম;বুদ্ধি বাধা দেয়,জিজ্ঞাসা করে কি পরিচয়,উদ্দেশ্যটা কি,কেন আনাগোনা;হৃদয় সে সব করে না,তার দ্বার উন্মুক্ত।কিন্তু হৃদয়ের ওই প্রশস্ত পথ প্রতারকও বটে।অনেকেই আসে এবং বেরিয়ে যায়,থাকে কম,কিন্তু যারা থাকে তারা স্থায়ীভাবে রয়ে যায়।’

আলমগীর স্বপন,সাংবাদিক almswapn45@gmail.com