Home / বই আলাপ / রাহুল সাংকৃত্যায়নের ‘ভোলগা থেকে গঙ্গা’ বেশী প্রভাবিত করেছে-কুমার দীপ

রাহুল সাংকৃত্যায়নের ‘ভোলগা থেকে গঙ্গা’ বেশী প্রভাবিত করেছে-কুমার দীপ

k-d

বইপড়া আর নিজের প্রিয় বই নিয়ে বলেছেন কবি কুমার দীপ

 

বইনিউজ : প্রথম কোন বই পড়ে আপনি সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত হয়েছেন?
কুমার দীপ : শৈশব-কৈশোরে একাধিক বই আমাকে প্রভাবিত করেছে; বিশেষত, রূপকথা-পৌরাণিক কাহিনি এবং রোমান্টিক উপন্যাসগুলো। তবে প্রথম যে বইটি পড়ে সবচাইতে বেশি প্রভাবিত হয়েছি, তার নাম ‘স্থাবর’। বনফুল তথা বলাই চাঁদ মুখোপাধ্যায়ের লেখা এই বইটি পাঠ করে আমার চিন্তজগতে বিরাট পরিবর্তনের ইঙ্গিত সূচিত হয়। মানুষের আদিম ও অরণ্যচারী জীবনকে নিয়ে রচিত এই মহাকাব্যিক উপন্যাসখানি মানবসভ্যতার বিবর্তনসূত্রটি দারুণ গল্পের ছলে ধরিয়ে দিয়েছিলো। এই বই-ই পরবর্তীতে রাহুল সাংকৃত্যায়নের ‘ভোলগা থেকে গঙ্গা’, প্রবীর ঘোষের অলৌকিক নয়, লৌকিক’ এবং এই জাতীয় বইয়ের দিকে আমাকে ঠেলে দ্যায়।

বইনিউজ : কোনো বই পড়ার পর সেই বইয়ের কোন চরিত্রের মতো হওয়ার বা তাকে অনুসরণ করার কী কখনো চেষ্টা করছনে? করে থাকলে পাঠকদের উদ্দেশ্যে বিস্তারিত বলুন?
কুমার দীপ : শৈশবে দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ঠাকুরমার ঝুলির সুন্দরী রাজকন্যাদের উদ্ধারকারী রাজপুত্র হতে চাইতাম। কিছুদিন পর বিভিন্ন রোমান্টিক উপন্যাসের নায়ক আমাকে আকৃষ্ট করতে থাকে, বিশেষত ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের ‘চিতা বহ্নিমান’ এবং নিমাই ভট্টাচার্যের ‘মেমসাহেব’-এর নায়কেরা আমাকে মুগ্ধবৎ প্রভাবিত করতে চেয়েছিলো; গভীর জীবনবোধ শানিত হওয়ার সময় ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ উপন্যাসের নায়ক পাভেলকেই অনেক বেশি অনুসরণযোগ্য মনে হয়েছে। তবে সার্বিকভাবে দৈনন্দিন জীবনে অনুসৃতি বলতে যা বোঝায় তা কোনো চরিত্রকে কেন্দ্র ঘটে নি।
বইনিউজ : আপনার পঠিত বাংলা সাহিত্যের একটি উপন্যাস পড়ার মজার স্মৃতি পাঠকদের সাথে শেয়ার করুন।
আমার পঠিত বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘পুতুর নাচের ইতিকথা’। এই বইটি পাঠের পরেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি আমার আকর্ষণ তীব্র হয় এবং তিনিই হয়ে ওঠেন আমার সবচাইতে প্রিয় কথাসাহিত্যিক। ‘পুতুর নাচের ইতিকথা’র প্রত্যেকটি চরিত্রই জীবন্ত; একবারের জন্যেও যে কাহিনিতে এসেছে, সেও ভয়ঙ্কর বাস্তবতা নিয়ে হাজির হয়েছে। শশি ডাক্তার তো অনিবার্য আপন জন হয়ে উঠেছিলো ! এই উপন্যাসটিতে এ্যাতোগুলো মানুষ, অথচ প্রত্যেকটি মানুষই স্বতন্ত্র ও জীবন্ত ! কী অনিবার্য ভাষাভঙ্গিমায় মানবজীবনকে তার সমস্ত সীমাবদ্ধতাসহ তুলে আনলেন মানিক ! কোনো টাইপ চরিত্র নেই ! হয়তো মজার নয়, তবে অনুল্লেখ্যপ্রায় একটি অভিজ্ঞতা আছে এই বইটি নিয়ে। তখন আমি মাস্টার্সের ছাত্র। যে কোর্সে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পাঠ্য ছিলো, সেই কোর্সের টিউটোরিয়াল ক্লাস ছিলো প্রফেসর আব্দুল জলিল স্যারের সাথে। স্যারের রাশভারি মেজাজের জন্য কেউ-ই প্রায় কিছু বলতে সাহস করতো না। আমিও বেশ ভীতুই ছিলাম। তবু স্যারের মানিক আলোচনার এক ফাঁকে আমি বলেই ফেললাম, ‘স্যার, অনেক সমালোচক ‘পদ্মা নদীর মাঝি’কেই তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস বলে থাকেন, আমাকে কিন্তু ‘পুতুর নাচের ইতিকথা’ই সবচাইতে টানে।’ স্যার বললেন , ‘মানে?’ আমি স্যারের চোখের দিকে একপলক তাকিয়ে কিছুটা ধাক্কা খেলাম বটে, কিন্তু পরমুহূর্তেই স্যার তাঁর সহজাত কোমল গাম্ভীর্য নিয়ে জানালেন, ‘তোমার টানটাই ঠিক।’

বইনিউজ : আপনার জীবনযাপন, চিন্তাধারা ইত্যাদি বদলে দেয়ার ক্ষেত্রে কোন বইয়রে অবদান রয়েছে কী? থাকলে সে ব্যাপারে আমাদের পাঠকদের বিস্তারিত জানান?
কুমার দীপ : আমার প্রথম জন্ম বাবা-মায়ের কাছে; দ্বিতীয় জন্ম বইয়ের কাছেই। মহাত্মা ম্যাক্সিম গোর্কি বলেছিলেন, ‘আমার মধ্যে উত্তম বলে যদি কিছু থাকে, তার জন্য আমি বইয়ের কাছেই ঋণী ।’ আমিও বিশ্বাস করি, বইয়ের চাইতে জ্ঞানী কেউ নেই পৃথিবীতে। থাকবেও না কোনোদিন। বই আমাকে যতো বেশি কাঁদিয়েছে-হাসিয়েছে ; যতো বেশি ভাবনার অতল সাগরে ডুবিয়েছে-ভাসিয়েছে; তার সমপরিমাণ তো দূরের কথা, কাছাকাছি কিছুও কারো পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয়, কোন বইটি আমাকে আলোড়িত করেছে সবচাইতে বেশি, কোন বইটি আমার চিন্তাধার বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রেখেছে; তখন কোনো নির্দিষ্ট একটি বইয়ের নাম না করে বলতে হয়: যখন যাকে হাতে নিয়েছি, সেই আমাকে নাড়াতে চেয়েছে, কেউ হয়তো পাতাটাও ছুঁতে পারে নি; কেউ আবার শিকড়সুদ্ধ নাড়িয়ে দিয়ে গেছে টর্নেডোর ধরণে। আমার কিশোর হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেওয়া, অনুভূতির সোনার আসন নেয়া প্রথম বইটি- ঠাকুরমার ঝুলি। দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের বড়ো সাইজের একটি ঠাকুরমার ঝুলি ছিলো আমাদের বাড়িতে। আমার ছোটদাকে পড়তে দেখতাম, পরে ওটা আমার রাত-দিনের আশ্রয় হয়ে যায়। এক-একটি গল্প যে কতো বার করে পড়েছি ! রাজকন্যা আর ফুলপরিদের মুক্ত করে আনার রহস্যময় গল্পগুলো কী যে আচ্ছন্ন করে রাখতো আমাকে ! শুধু আমাকে ক্যানো, আরো অনেককে। আমার গ্রামের দু-একজন এমন মানুষ ছিলো যারা পড়তে পারে না বলে আমার কাছে আসতো গল্পগুলোর পাঠ শুনবার জন্যে। এছাড়া নানারকমের রূপকথা পড়ারও সময় ছিলো সেটা। উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর চমৎকার গল্পগুলো, এবং তাঁর ছোটদের রামায়ণ, মহাভারতও পড়েছি মুগ্ধতার মিনারে বসে। নানারকমের ধাঁধার বই এবং গোপাল ভাঁড় বা বীরবলের মতো হাস্যরসের কাহিনিগুলোও পড়া হতো মাঝে-মধ্যে। হাইস্কুলে পড়ার সময়েই শরৎচন্দ্র, ফাল্গুণী মুখোপাধ্যায়, নীহার রঞ্জন গুপ্তসহ অল্পখ্যাত কয়েকজনের উপন্যাসের প্রতিও আকৃষ্ট হয়েছিলাম। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়েই হাতে নিয়েছিলাম মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদ বধ কাব্য’। কিন্তু তখনও আমার দাঁত ওটা চিবোনোর মতো পোক্ত হয় নি। বঙ্কিম চন্দ্রের ‘দুর্গেশ নন্দিনী’ পাঠের অভিজ্ঞতাও প্রায় অনুরূপ। তবু চেষ্টা স্থিমিত হয় না। কলেজে উঠতে না উঠতেই, মগজের আড়ষ্ঠতা ভাঙার সাথে সাথে বইয়ের রাজ্যেরও সভ্য হয়ে উঠি কিছুটা। আমার মামার ছিলো বইয়ের দোকান। শ্যামনগর বাজারের প্রথম এবং বড়ো দোকান পল্লীমঙ্গল লাইব্রেরিতে আমি তখন নিত্য বসি। যতটা কলেজে ক্লাস করি, তার চাইতেও বেশি ক্লাস করি পল্লীমঙ্গলের বইয়ের পাতায়। বই পেলেই পড়ি; বিশেষত কবিতা-উপন্যাস। দোকানে বসে পড়ি, বাড়িতে নিয়ে এসে পড়ি। পড়ে দোকানে রেখে আবার একটা নিই। বঙ্কিম, শরৎচন্দ্র, ফাল্গুণী, নীহার রঞ্জন গুপ্ত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, নিমাই ভট্টাচার্য, শংকর, যাযাবর, প্রমুখের উপন্যাস আমার শীর্ষ আকর্ষণ; রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসীমউদ্দীনের কবিতা তখন আমার প্রিয় সহচর। শ্যামনগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ-এর লাইব্রেরি থেকেও পড়েছিলাম কয়েকটি বই। নির্মলেন্দু গুণের একটি কবিতাসংকলন (সম্ভবত ‘নির্বাচিতা’ কিংবা ‘রাজনৈতিক কবিতা’) এসময় আমার খুব আপন হয়ে ওঠে; বিশেষত রাজনৈতিক কবিতাগুলোকে মনে হয় তারুণ্যের বিস্ফোরণ। বঙ্কিমের ‘কপালকু-লা’, ‘মৃণালিনী’; শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’, ‘বিপ্রদাস’ ‘দেনাপাওনা’; ফাল্গুণী মুখোপাধ্যায়ের ‘চিতা বহ্নিমান’, ‘শাপমোচন’; নীহার রঞ্জন গুপ্তের ‘ধূপশিখা’; যাযাবরের ‘দৃষ্টিপাত’; নিমাই ভট্টাচার্যের ‘মেমসাহেব’ ইত্যাদি কাহিনিপ্রধান উপন্যাসগুলো আমার তখনকার মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো অনেক দিন। পড়েছি খ্যাত-অখ্যাত আরও অনেক লেখকের উপন্যাস। অপেক্ষাকৃত হালকা চালের, একটু রোমান্স রহস্যে ভরা কাহিনিগুলোই যে বেশি ভালো লাগতো তা এখন বুঝি। পাঠ্য বইয়ের বাইরের বই পড়ার যথেষ্ট স্বাধীনতা ছিলো আমাদের বাড়িতে, তবু রাত্রি জেগে উপন্যাস পড়ছি জানলে বাবা কিংবা ছোটদা বকা দেবেন ভেবে মাঝে-মধ্যে লুকিয়েই রাখতাম পাঠ্যবইয়ের পাতার আড়ালে। মনে পড়ে ‘চিতা বহ্নিমান’ পড়া শেষ করেছিলাম রাত্রি প্রায় ৪টার দিকে। অবশ্য সুনীলের ‘যুবক যুবতীরা’ উপন্যাসটি নাম এবং উপরের ছবির কারণে লুকিয়ে না পড়ে কোনো উপায় ছিলো না। এখনকার ছেলেরা এ্যান্ড্রয়েড মোবাইল বা ট্যাব ছাড়া হাতে অন্য কিছু ভাবতে পারে না, আমি বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে বের হলেও হাতে থাকতো একটি বই। আমার একটা নোটবুক ছিলো, যাতে লেখা হতো আমার পঠিত বইয়ের নাম এবং তা পড়ে ক্যামন লাগলো তার সংকেত। সাহিত্যের পাশা-পাশি বাংলাদেশ ও বিশ্বের সাধারণ জ্ঞানের ডায়েরি ছিলো আমার আগ্রহের অন্যতম জায়গা। বিশ্ব ইতিহাসের অসাধারণ ও বিচিত্র সব ঘটনাগুলো এবং খেলাধুলার খবর বরাবরই আলোড়িত করতো আমাকে।
তবে ঠিক গভীর ও চিন্তাশীল সাহিত্য-দর্শনের বইগুলোর সংস্পর্শে এসেছি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ভর্তি হওয়ার পর। নিজের কেনার সামর্থ্য ছিলো না, কিন্তু বই আমাকে টেনে নিয়ে যেতো বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরির সুবিশাল সংগ্রহশালায় এবং বাংলা বিভাগের সেমিনারে। ক্লাস শেষে রুমে এসে খেয়ে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে অথবা না নিয়ে ছুটে গেছি লাইব্রেরিকক্ষে; কখনও আবার রুমে না এসেই। রাত আটটায় লাইব্রেরি বন্ধ হওয়ার ১৫ মিনিট আগে সাইরেন বেজে উঠলে শেষ যারা বেরিয়ে আসতো, আমি তাদেরই একজন। এসময় যখন বনফুলের ‘স্থাবর’ পাঠ করলাম, উপন্যাসের জগৎটাই আমার কাছে পাল্টে গ্যালো ! মানবসভ্যতার বিবর্তনের এক অনিবার্য পাঠ ইতিহাসই য্যানো আমার সামনে মূর্ত হয়ে উঠলো ! রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’, ‘চোখের বালি’ কিংবা শরৎচন্দ্রের ‘গৃহদাহ’, ‘চরিত্রহীন’, এর মতো উপন্যাসগুলোকেই মনে হতো প্রিয় উপন্যাসের পটভূমি । এগুলোর প্রতিটিই প্রিয় হয়ে উঠলেও অনতিকাল পরেই প্রিয়তার এক বিরাট জায়গা দখল করে নিলেন তিন বন্দ্যোপাধ্যায়। বিভূতির ‘পথের পাঁচালী’ অপেক্ষা তারাশঙ্করের ‘কবি’ আমার অন্তরকে বিমোহিত করেছিলো অধিক। ‘ এই খেদ আমার মনে-/ ভালোবেসে মিটল না সাধ, কুলাল না এ জীবনে।/ হায় – জীবন এত ছোট কেনে ?/ এ ভূবনে ?’… ‘কবি’র এই কথাগুলো বুকের ভেতর হু হু করে কেঁদে উঠেছিলো সেদিন ! তবে এককভাবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ই বোধ হয় প্রিয়তর কথাসাহিত্যিক। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ‘দিবা-রাত্রির কাব্য’, ‘অহিংসা’, ‘চতুষ্কোন’ : প্রতিটি উপন্যাসই আমাকে অতুল টেনেছে; তবে তাঁর ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ পড়ে আমি ভাবনার অতলে হারিয়ে গিয়েছিলাম। শহীদুল্লা কায়সারের ‘সারেং বৌ’ ও ‘সংশপ্তক’ আমার ভালোলাগা দুটি উপন্যাস; তবে সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহর ‘চাঁদের অমাবস্যা’ আমাকে সাময়িকভাবে স্তব্ধ করে দিয়েছিলো; আক্তারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলে কোঠার সেপাই’ও আমাকে মোহিত করেছিলো। আরও অনেক পরে এসে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পূর্ব-পশ্চিম, সেলিনা হোসেনের ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ আমাকে ইতিহাসের দিকে ফিরিয়ে নিয়েছে। অন্যদিকে, কমল কুমার মজুমদারের ‘অন্তর্জলী যাত্রা’, অভিজিৎ সেনের ‘রহু চ-ালের হাড়’, হাসান আজিজুল হকের ‘আগুন পাখি’, শহীদুল জহিরের ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ ও ‘সে রাতে পূর্ণিমা ছিলো’ এবং জাকির তালুকদারের ‘পিতৃগণ’… এগুলোই গত কয়েক বছরের ভেতরে পঠিত কয়েকটি অত্যুজ্জ্বল বাংলা উপন্যাস। মানুষের প্রাণহীন শরীর পোড়ে যেখানে, মড়া পোড়া গন্ধ আর স্বজনদের আহাজারিতে ভরে থাকার কথা, সেখানে, সেই শ্মশানদেশে একজন মৃত্যুপথযাত্রী প্রৌঢ়ের মরণদৃশ্য নিয়ে এমন এরকম রহস্যঘন, শৈল্পিক, লোমহর্ষক চিত-প্রতিচিত্রাদির উপস্থাপনে অতুল্য, অনিন্দ্য ভাষাসৌকর্য বিনির্মিত হতে পারে, ‘অন্তর্জলী যাত্রা’ হাতে না এলে কোনোদিনই হয়তো জানতাম না। অভিজিৎ সেনের ‘রহু চ-ালের হাড়’ কেবল কাহিনী নির্মাণের ভিন্নধর্মিতা কিংবা উপমহাদেশের এক বিশেষ যাযাবরী জনগোষ্ঠীকে নিয়ে মহাকাব্যিক উপাখ্যানের জন্যই বিশিষ্ট নয়, উপাখ্যানের অভ্যন্তরে যে চরিত্রসমূহকে আমাদের অন্তরাকাশে দৃশ্যমান করে তোলে, তার জন্যও অনন্যতর। সাতচল্লিশের দেশবিভাগের পটভূমিতে লেখা ‘আগুন পাখি’ না পড়লে গল্পভাষার অনন্য কারিগর হাসান আজিজুল হকের ঔপন্যাসিক সত্তার অপূর্ব ভাষাসৌকর্য থেকে বঞ্চিত হতাম। জহিরের সব উপন্যাসই ভাষাবিন্যাসে স্বতন্ত্র; তবু ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ ও ‘সে রাতে পূর্ণিমা ছিলো’ বই দুটো যে আমাকে অভিভূত করেছে, তা বলাই বাহুল্য। আর জাকির তালুকদারের অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য প্রশস্তশরীরী উপন্যাস ‘পিতৃগণ’ কেবল গত কয়েক বছরের মধ্যে প্রকাশিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাংলা উপন্যাস নয়; সমগ্র বাংলা সাহিত্যেরই স্থায়ী সম্পদ হয়ে উঠবার যোগ্য তা আমি আগেই লিখেছি একাধিক পত্রিকায়। বাংলা উপন্যাসের বাইরে বলবার মতো তেমন পঠন আমার নেই। কিন্তু যে কয়টি পড়েছি; এক কথায় অপরূপ ! এর ভেতরে ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’; লিও টলস্টয়ের ‘রেজারেকশান’, ‘আনা কারেনিনা’; ডিএইচ লরেন্সের ‘লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার’; গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘আমার নিঃসঙ্গতার একশ বছর’; ইয়েস্তেন গার্ডারের ‘সোফির জগৎ’; ডান ব্রাউনের ‘দ্য ভিঞ্চি কোড’ প্রভৃতি বই ক’টি আমাকে বেশ আলোড়িত করেছে।
কবিতার ক্ষেত্রে কোনো একক বইয়ের কথা বলা মুশকিল। তবু মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদ বধ কাব্য’ অবিস্মরণীয়। আর রবীন্দ্রনাথের ‘সঞ্চয়িতা’ কিংবা নজরুলের ‘সঞ্চিতা’কে একক বই হিশেবে ধরলে এদুয়ের পাঠাভিজ্ঞতা অসাধারণ ! অনুভূতির অসামান্যতা নিয়ে পাঠ করেছি জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’, ‘মহাপৃথিবী’ প্রভৃতি কাব্যের কবিতাগুলো। মহামূল্য অনুভব দিয়েছে সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ছাড়পত্র’ ও ‘ঘুম নেই’ এর কবিতাগুলো। শামসুর রাহমানের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ সংকলনটি এবং আল মাহমুদের ‘সোনালী কাবিন’ পাঠও অনিন্দ্য কাব্যানুভূতির জন্ম দিয়েছে। রবি ঠাকুরের ‘গল্পগুচ্ছ’, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর ‘নির্বাচিত গল্প, জগদীশ গুপ্ত’র ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’, বনফুলের ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’ কিংবা হাসান আজিজুল হক ও শহীদুল জহিরের গল্পগুলো আমাকে বিমোহিত করেছে বৈকি।
প্রাপ্ত বয়স্ক প্রেমে আবেগ অপেক্ষা যুক্তির প্রাধান্য থাকে। পূর্ণ বয়সে আমি ইতিহাস-সভ্যতা-বিজ্ঞান-বিবর্তন-যুক্তিবাদ-নারী-জাতিসত্ত্বা-ধর্ম-পুরাণ-শিক্ষা প্রভৃতি গভীর জ্ঞানানুসন্ধানী প্রবন্ধের অনুরক্ত। ফলে কার্ল মাক্র্স, ফ্রেডেরিক এঙ্গেল্স, ওমর খৈয়াম, বাট্রান্ড রাসেল, কারেন আর্মস্ট্রং, রাহুল সাংকৃত্যায়ন, আহমদ শরীফ, হুমায়ুন আজাদ, আরজ আলী মাতুব্বর, প্রবীর ঘোষ, সরদার ফজলুল করিম, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, যতীন সরকার প্রমুখের বেশ কিছু রচনা আমাকে বাধ্য করে ভাবসমুদ্রের তলদেশে নিষ্পলক ডুবে থাকতে।

বইনিউজ : সম্প্রতি পড়েছেন এমন একটি ভালো বই সর্ম্পকে আপনার অভিজ্ঞতা আমাদের পাঠকদের জানান?
কুমার দীপ: আমি একই সঙ্গে একাধিক বই পড়ে থাকি। কখনও কখনও তা ৭/৮টিও হতে পারে। যেমন, গত বেশ কিছুদিন ধরে যে বইগুলো পড়ছি সেগুলোর উল্লেখযোগ্য হলো : প্যাল্টাজেট সমারসেট ফ্রাই এঁর ‘দ্য হিস্টরি অভ্ দ্যা ওয়ার্লড’ (অনীশ দাশ অপু’র অনুবাদে); নৃসিংহ প্রসাদ ভাদুড়ি’র ‘মহাভারত : নীতি অনীতি দুর্নীতি’; ধীরেশ চন্দ্র ভট্টাচার্যের ‘মহাভারতের একশটি দুর্লভ মুহূর্ত’; রাজশেখর বসুর ‘মহাভারত’; হুমায়ুন আজাদের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’; যতীন সরকারের ‘সাঁকো বাঁধার প্রত্যয়’; শঙ্খ ঘোষের ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ এবং আহমদ শরীফের ডায়েরি ‘ভাব বুদ্বুদ’। প্রত্যেকটি বই-ই পাঠের অভিজ্ঞতা অসামান্য। কোনো একটি বই সম্পর্কে দু-এক কথা বলবার জন্যে হুমায়ুন আজাদের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’কেই বেছে নিতে পারি। যারা আজাদের গদ্য সম্পর্কেই অধিক অবহিত, তারা জানেন তাঁর পঠন-পাঠন-উপলব্ধি ও বৈদগ্ধের মাত্রা কতো গভীর, বিচিত্র ও ভবিষ্যদ্দৃষ্ট। কবিতাপাঠের সেই আজাদের সাথে যুক্ত হন অন্য এক আজাদ যিনি প্রত্যেকটি পঙক্তিকে কেবল কবিতার নৈপূণ্য দিয়েই সাজান না, অসামান্য শৈল্পিক অনুরণন-এর সঞ্চার করেন। বাংলাদেশকে নিয়ে তাঁর অবিশ্বাস্য দ্রোহঋদ্ধ বাস্তবদর্শনভিত্তিক বিখ্যাত কবিতা ‘সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’র কথা বাংলাদেশের কবিতার প্রকৃত পাঠকমাত্রেরই জানবার কথা। ‘নষ্টদের দানবমুঠোতে ধরা পড়বে সব পরিষদ’; ‘সবচে সুন্দর মেয়ে দুটি হাতে টেনে সারারাত/ চুষবে নষ্টের লিঙ্গ। লম্পটের অশ্লীল উরুতে/ গাঁথা থাকবে অপার্থিব সৌন্দর্যের দেবী।’-এর প্রবচনতুল্য পঙক্তি আজাদের কবিতাকে অন্য একটি মাত্রা দিয়েছে। বাংলাদেশের অমানবিক ও নেতিবাচক সমস্ত বিষয়ই তাকে কীভাবে ব্যথিত করেছে তার প্রমাণ ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র পরতে পরতে বিদ্যমান। সংকলনের প্রথম কবিতা ‘আমার সন্তান’র শুরুটা এরকম :

আমার সন্তান যাবে অধঃপাতে, চন্দ্রালোক নীল বন
তাকে কভু মোহিত করবে না। কেবল হোঁচট খাবে
রাস্তায়
সিঁড়িতে
ড্রয়িংরুমে
সমভূমি মনে হবে বন্ধুর পাহাড়
উল্টে পা হড়কে পড়ে যাবে
নিচে
আরো নিচে
ময়লায়
ড্রেনে
প্রতিটি অঙ্গের দ্রোহ তার দেহ সারক্ষণ করবে মোথিত
সে ভয় পাবে
হাতছানি
কালো চোখ…
‘আমার কন্যার জন্য প্রার্থনা’ কবিতায় দেখি : ‘এদেশ বদলে যাচ্ছে, যা কিছু একান্ত, এর/ সবই নির্বিচারে নির্বাসিত হচ্ছে প্রতিদিন/ ফ্রিজ ধরে রাখছে ঠান্ডা দিঘি সজীব শব্জিক্ষেত্রের স্মৃতি’; ‘বাঙলাদেশের কথা’ কবিতায় লিখেছেন,
তোমাকে মিনতি করি কখনো আমাকে তুমি বাঙলাদেশের কথা তুলে কষ্ট দিয়ো না।
জানতে চেয়ো না তুমি ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের কথা; তার রাজনীতি,
অর্থনীতি, ধর্ম, পাপ, মিথ্যাচার, পালে পালে মনুষ্যম-লী, জীবনযাপন, হত্যা, ধর্ষণ,
মধ্যযুগের দিকে অন্ধের মতোন যাত্রা সম্পর্কে প্রশ্ন ক’রে আমাকে পীড়ন কোরো না;
আমি মুহূর্তও সহ্য করতে পারি না, – তার অনেক কারণ রয়েছে।
এরকম পঙক্তি না বাড়িয়ে, কবিতার ব্যবচ্ছেদ করবার অপ্রাসঙ্গিক চেষ্টা না করে বরং বলি, কবিতা হলো মানুষের অনিন্দ্য অনিভূতির শিল্পিত ও অনিবার্য প্রকাশ; পাঠ না করলে জীবন সম্পর্কে কোনো নান্দনিক দর্শনবোধ তৈরি হয় না। পারলে মাঝে মাঝে কবিতার কাছে ফিরে যান। মৃতসঞ্জীবনীর কাছে যান।