Home / বই আলাপ / আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি পড়ে খুব প্রভাবিত হয়েছিলাম-পিয়াস মজিদ

আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি পড়ে খুব প্রভাবিত হয়েছিলাম-পিয়াস মজিদ

p-m-pবইপড়া আর নিজের প্রিয় বই নিয়ে বলেছেন কবি পিয়াস মজিদ

বইনিউজ : প্রথম কোন বই পড়ে আপনি সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত হয়েছেন?
পিয়াস মজিদ : আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি পড়ে খুব প্রভাবিত হয়েছিলাম। মনে আছে পাঠ্যবইয়ের নিচে রেখে লুকিয়ে পড়েছি এক বন্ধুর কাছ থেকে ধার করে আনা অনূদিত বইটি। বোঝা না বোঝায় মিলিয়ে এক দূরদেশি অকালগত বালিকা অনেকটাই অধিকার করে নিয়েছিল আমার কিশোরমন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, নাৎসি জার্মানি, হিটলারি তাণ্ডব আর বৈরি পৃথিবীর আঁচ গলিয়ে আনা ফ্রাঙ্কের পরিবারের পাতালবাস, এরই মাঝে মেয়েটির বেড়ে ওঠা, নবজাগ্রত অনুভবের কুঁড়িগুলোর ডায়েরি পাতায় পুষ্পিত বিকাশ, অনিশ্চিত আগামীর মুখোমুখি এক অশ্লেষার রাক্ষসী বেলায় বন্ধু পিটারকে ঘিরে তার স্বগত সংলাপ- মনে হচ্ছিল যেন আমাকেই বলছে আনা তার অতি সংক্ষিপ্ত জীবনের দুঃখভারাতুর কথামালা। পরবর্তীকালে কতো কিছু জেনেছি বিশ্বরাজনীতি, ফ্যাসিবাদ, কনসেনট্রেশন ক্যাম্প, অগণন কবি-লেখক-শিল্পীর আত্মকথায় বিধৃত সেই দুঃসময়ের মৃত্যুময় কথকতা, প্রিয় কত চলচ্চিত্রে বাঙময় দেখেছি বিশ্বযুদ্ধের আগুন এবং প্লাবন কিন্তু কৈশোরে পড়া আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি’র মতো কোন কিছুই আমাকে এতটা প্রভাবিত করেনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়তে গেছি যখন, ক্লাসের এক সাম্প্রদায়িক শিক্ষক হিটলার-বন্দনা করছিলেন- আমি তখন ভাবছিলাম আনা ফ্রাঙ্কের কথা যে তার বিষাদের রঙ ধার দিয়ে আমাকেও ডায়েরি লিখতে শিখিয়েছে। দিয়েছে এই বোধ যে- হিটলার হোক, বুশ হোক আর সেই শিক্ষকই হোক- অনেক বিকৃত বড়ো আদর্শবাদের কাছেই মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বেদনার হয়তো কোন মূল্য নেই।
এখনও যখন নিজের কাছে নিজে ভেঙে পড়ি, তখন সেই আহত অবস্থার ক্ষত আর মঞ্জরিগুলো আনার মতোই লিখে রাখি দিন ও রাতলিপির আকারে।

বইনিউজ : কোনো বই পড়ার পর সেই বইয়ের কোন চরিত্রের মতো হওয়ার বা তাকে অনুসরণ করার কী কখনো চেষ্টা করছেন? করে থাকলে পাঠকদের উদ্দ্যেশ্যে বিস্তারিত বলুন?
পিয়াস মজিদ : রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’ নাট্যবইয়ের অমল হতে চেয়েছি কিংবা ভেতরে ভেতরে অমলইতো ছিলাম আমি। মানুষ হতে চায় শক্তপোক্ত, বড় লক্ষ্যের, সমাজ-সংসার বদলে দেয়ার সামর্থ্যবান কোনকিছু; আর আমি চেয়েছি পৃথিবী থেকে পালানোর, বিবরবাসী এক বালক- অমল। ‘দইওয়ালা, ও দইওয়ালা’ বলে ডাকতে চেয়েছি আমার অজানা আকাশ, মুক্তি আর আলোকে। স্কুল-সিলেবাসে পাঠ্য ছিল ‘ডাকঘর’-এর নির্বাচিত এক অংশ যেটা এ নাটকের প্রকৃত মর্ম অনুধাবনে যথেষ্ট ছিল না। তবে সংকেতগুলো পেয়েছি কিছু কিছু। পরে যখন পুরো বইটি পড়লাম তখন যেন আত্মঅবয়ব খুঁজে পেলাম অমলের মধ্যে। এতদিন দ্বিধা ছিল, এবার মনে হলো- এই তো হতে চেয়েছি আমি, অমলেরই মতো একটা ছোট্ট এলেবেলে মানুষ। এই বণিক-পৃথিবীতে যে শুধু এক সুধাময় ডাকঘর থেকে আসা চিঠির অপেক্ষা বাঁচিয়ে রাখে।

b-1
বইনিউজ : আপনার পঠিত বাংলা সাহিত্যের সেরা একটি উপন্যাস পড়ার মজার স্মৃতি পাঠকদের সাথে শেয়ার করুন।
পিয়াস মজিদ : বাংলা সাহিত্যে আমার প্রিয়, প্রিয়তর এবং প্রিয়তম উপন্যাস মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’। উপন্যাসের প্রধান-অপ্রধান সকল চরিত্র- শশী, কুসুম, যামিনী কবিরাজ, হারু ঘোষ, গাওদিয়া গ্রাম, আকাশের দেবতার কটাক্ষ হানা, তালবন, টিলা আর সেই সম্মোহক শব্দাবলি- ‘তালবনে আর কখনো যাইবেনা শশী, টিলায় দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখিবার সাধ এ জীবনে আর কখনো তার হইবে না’ কিংবা ‘শরীর শরীর, তোমার মন নাই কুসুম’ আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায় সবসময়।
তো, এই প্রিয় উপন্যাসের পটভূমি-গ্রাম গাওদিয়া এখন মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলায় পড়েছে। মানিকের মামাবাড়ি বলে জনশ্রুতও বটে। সেখানকার কিছু মানুষের সাথে আমার পরিচয় হয় বেশ কয়েক বছর আগে, তারা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতি রক্ষার্থে একটা পাঠাগার করতে চাইছিলো- আমরা কয়েক বন্ধুও তাতে সানন্দে সহযোগী হলাম। আমি উপন্যাসের একটা অংশ মনে করতে পারলাম যেখানে গাওদিয়া গ্রাম সম্পর্কে শশীর আক্ষেপ ছিল ‘ও ভগবান, একটা লাইব্রেরী পর্যন্ত যে এখানে নাই’। পাঠাগার উদ্বোধনের দিন পত্রিকায় নিবন্ধ লিখে আমি বললাম যে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আক্ষেপ আজ দূর হয়েছে, গাওদিয়া গ্রামের তাঁর নামেই লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা লাইব্রেরির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারকে নিয়ে গিয়েছিলাম আর আনন্দের ব্যাপার ছিল এই খবর পেয়ে কলকাতা থেকে মানিকের জামাতা যুগান্তর চক্রবর্তী আমাদের অভিনন্দন জানিয়ে চিঠি দিয়েছিলেন। এভাবে প্রিয় বই শেষ পর্যন্ত পাঠাগার প্রতিষ্ঠার নেপথ্য-প্রাণনা দিয়েছিল আমাকে।

বইনিউজ : আপনার জীবনযাপন, চিন্তাধারা ইত্যাদি বদলে দেয়ার ক্ষেত্রে কোন বইয়ের অবদান রয়েছে কী? থাকলে সে ব্যাপারে আমাদের পাঠকদের বিস্তারিত জানান?
পিয়াস মজিদ : হুমায়ুন আজাদের ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল। কলেজ সহপাঠী রবি দিয়েছিল বইটি। এর আগে পড়েছে আজাদের ‘লাল নীল দীপাবলী’ আর কত নদী সরোবর কিন্তু তাঁর এই উপন্যাসটি বলা যায়, আমার রুচির সব নাবালক কোষগুলো দুমড়ে মুচড়ে দেয়।
উপন্যাসের চরিত্র রাশেদের মতোই আমি দেখেছি দশদিকে সুনীতির মচ্ছবের আড়ালে খল-বদমাশদের পেচ্ছাবের ধারা কী বিপুল বৈভবে প্রবাহিত হয়ে দখল নেয় নদীনালা-নিসর্গ-মনুষ্যত্ব। শাস্ত্রের ভেলকিতে আবার এসব কিছু সিদ্ধও হয়ে যায় কেমন! রাশেদ দেখেছে সমরতন্ত্র শুধু এদেশের ক্ষমতাবলয়কে দখল করেনি, মানুষের মস্তিষ্কেও পড়িয়ে দিয়ে গেছে অমোচ্য ব্যারিকেড। রাশেদ যেমন তার সমকালে সুশীল মানুষকে বলতে শুনেছে ‘ডেমোক্রেসির চেয়ে আইয়ুব খানের বুটের বাড়িই ভালো ছিল’ তেমনি আমিও রাশেদের সাথে মিলিয়ে দেখতে পেরেছি আমার বাংলাদেশকে। সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সময়ে ; আমাদেরর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের উপর হঠাৎ একদিন যখন নেমে আসলো নির্যাতনের খড়গ তখন গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার ‘নিয়ন্ত্রিত’ অর্থ বের করা বুদ্ধিজীবীর প্রাদুর্ভাবও লক্ষ করেছি সবিস্ময়ে।
ছাপ্পানো হাজার বর্গমাইল আমি একবারে পড়তে পারি নি, সময় নিয়ে পড়েছি; কারণ যে সময়ের সন্তান আমি সে সময়টাতো ধোঁয়াশায় ভরা। আঁধি কাটতে চায় না মোটেও। উপন্যাসটিতে সংলাপ ও বর্ণনায় ‘বিকার’-এর লক্ষণ দেখেছেন অনেক সমালোচক কিন্তু আমার মনে হয়েছে হুমায়ুন আজাদ বারংবার বিদ্ধ করে আমার, আমাদের স্পষ্ট দেখিয়েছেন- সমসময়ের গায়ে জমে থাকা বিকারের গভীর দাগগুলো।

বইনিউজ : সম্প্রতি পড়েছেন এমন একটি ভালো বই সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা আমাদের পাঠকদের জানান?
পিয়াস মজিদ : দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত এবং সম্প্রতি পুস্তকাকারে বের হওয়া বাদল বসুর ‘পিওন থেকে প্রকাশক’ নামের স্মৃতিকথার বইটি। বইয়ের শিরোনামই প্রমাণ করে লেখক কতোটা অকপট। আমরা একটা পর্যায়ে পৌঁছে গেলে আর নিজের অবনত অতীত সম্পর্কে কিছু বলা তো দূরের কথা স্বীকারই করতে চাই না ; সেখানে বাদল বসু ‘প্রকাশক’ শব্দের আগে ‘পিওন’ শব্দটি জুড়ে দিয়ে মানুষ হিসেবে তাঁর হৃদয়িক প্রসারতার পরিচয় দিয়েছেন। আধুনিক বাংলা প্রকাশনার আদিঅন্ত জানতে বুঝতে বইটি ফিকশনাল গাইড হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করি। বাদল বসু বইয়ের অন্তর্বস্তু থেকে লেখকের অন্তর্মহল সবকিছু যেমন সরস ভাষা ও বর্ণনায় তুলে ধরেছেন তা আমার কাছে অনন্য মনে হয়েছে।
কিশলয় ঠাকুরের ‘পথের কবি’, সমরেশ বসুর ‘দেখি নাই ফিরে’, নীরদ সি চৌধুরীর ‘আমার দেবোত্তর সম্পত্তি’র মতো খ্যাতনামা বইয়ের জন্মরহস্য, সত্যজিৎ রায়ের বই- ‘আঁকিবুকি কিংবা বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়ি’, সুনীলের ‘স্বর্ণময় সম্ভার’ কিংবা আমাদের বেলাল চৌধুরীর সাথে বন্ধুত্বের আখ্যান  হয়ে তরুণতর কবি লেখকদের জীবন ও সৃষ্টিবর্ণনায় ভাস্বর বইটির একেবারে শেষ অধ্যায়ে এসে লেখক নিজের পরিবারের কথা লিখেছেন।
বই এবং প্রকাশনা জগৎ তাঁর জীবনের এতটাই অধিকার করে ছিল যে এরাই আত্মকথার সিংহভাগ দখল করে নিয়েছে, রক্তসূত্রীয় স্বজনরা এসেছেন সবশেষে। ধারাবাহিক লেখাটির শেষভাগে এসে কর্কটরোগে আক্রান্ত লেখক সংশয় প্রকাশ করে গিয়েছিলেন যে, এই পরিচ্ছেদটি যখন মুদ্রিত আকারে পাঠক পড়বেন তখন হয়তো তিনি থাকবেন না। হয়েছেও তাই।
ভাবছি, কাল বইটি আবার নতুন করে পড়তে শুরু করবো।