Home / বই আলাপ / আমি মনে হয় অপুর মতো হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম-হামীম কামরুল হক

আমি মনে হয় অপুর মতো হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম-হামীম কামরুল হক

hhhবইপড়া আর নিজের প্রিয় বই নিয়ে বলেছেন কবি-কথাশিল্পী হামীম কামরুল হক

 

বইনিউজ : প্রথম কোন বই পড়ে আপনি সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত হয়েছেন?

হামীম কামরুল হক : মনে হয় দুটো বই – হারম্যান হেসের ‘সিদ্ধার্থ’ ও আলবেয়ার কাম্যুর ‘দ্যা আউটসাইডার’। ‘সিদ্ধার্থ’ আগে পড়েছিলাম। সেই অর্থে ‘সিদ্ধার্থ’ই প্রথম। আমি কে? আমরা কী করা উচিত? জীবনের অর্থ কী? জ্ঞান অর্জন কী? ইত্যাদি প্রশ্নের দিকে ঠেলে দিয়েছিল এই বই। আর যদি বলেন কোন বই আমাকে সাহিত্যকে ভালোবাসার দিকে ও লেখালেখির দিকে ঠেলে দিয়েছিল তাহলে সেটি হল বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপরাজিত’ ও ‘কাজল’।

বইনিউজ : কোনো বই পড়ার পর সেই বইয়ের কোন চরিত্রের মতো হওয়ার বা তাকে অনুসরণ করার কী কখনো চেষ্টা করছেন? করে থাকলে পাঠকদের উদ্দ্যেশ্যে বিস্তারিত বলুন?

হামীম কামরুল হক : আমি মনে হয় অপুর মতো হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। সেটা নবম-দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়। ‘পথের পাঁচালী’ এমন করে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল যে বলবার মতো নয়। তারপর যখন পরের দুটো বই পড়ি ‘অপরাজিত’ ও ‘কাজল’ – তখন তো ঘোর আরো বেড়ে উঠেছিল। সত্যজিৎ রায়ের অপুর ট্রিলজি দেখার অনেক আগে থেকে আমি নিজের মনেই অবিরাম এই সিনেমা দেখে যাচ্ছিলাম। সব কিছু এত জীবন্তভাবে দেখছিলাম যে মনে হতো এরা সবাই রক্তমাংসে বেঁচে আছে। অনুসরণ করা বলতে ওই বনে বাদাড়ে ঘোরার মতো কিছু ছিল না আমার, কিন্তু আমি বার বার সাগর পাড়ে চলে যেতাম। তখন চট্টগ্রামে থাকি। বন্দরটিলায়। বাসার খুব কাছেই সমুদ্র। বহু সকাল ও বিকাল আমি অর্থহীনভাবে সমুদ্রে পাড়ে কাটিয়ে ছিলাম।

hhhবইনিউজ : আপনার পঠিত বাংলা সাহিত্যের সেরা একটি উপন্যাস পড়ার মজার স্মৃতি পাঠকদের সাথে শেয়ার করুন।

হামীম কামরুল হক : মনে হয় একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে পাঠ্য হিসেবে ‘লালসালু’ ছিল। আমাদের শিক্ষক রফিক কায়সার দারুণ করে পড়াতে শুরু করলেন সেই উপন্যাস। প্রথম ক্লাসে তিনি উপন্যাস সম্পর্কে, উপন্যাসের বিবর্তন এবং বাংলা উপন্যাস শুরু থেকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ পর্যন্ত কী কী বাঁক পার হয়েছিল, সেসব বলেছিলেন। তাঁর ওই লেকচারটা আমার জীবনের মনে হয় গতিই বদল করে দিয়েছিল। উপন্যাসের প্রতি এতবেশি আকৃষ্ট হয়েছিলাম যে জীবন ও উপন্যাস একার্থক হয়ে উঠেছিল। সবচেয়ে মজার ছিল সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র গদ্য নিয়ে। কাটাকাটা গদ্য দিয়ে আমি সেই সময় আমাদের সহপাঠী রুবাইয়াৎ সাজ্জাদের সঙ্গে মজা করতাম। ওই একটু মোটাসোটা ছিল, তার বর্ণনা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ কীভাবে দিতেন, সেটা আমি নিজের মতো করে লিখেছিলাম। সাজ্জাদ নিজে দুর্দান্ত পাঠক ছিল। রাজ্যের বই পড়তো। ও আমার বর্ণনায় খুব হেসেছিল। এটাকে একটা মজার স্মৃতি বলা যায়। আর পরে কমলকুমার মজুমদারের উপন্যাস ‘সুহাসিনীর পমেটম’ সাত বারের চেষ্টা পড়েছিলাম, শেষ বারে যখন উপন্যাসে ঢুকতে পারলাম, কী যে আনন্দ পেয়েছিলাম বলবার মতো নয়। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কুবেরর বিষয় আশয়’ উপন্যাসটাও আমি চার বার পড়ে ছেড়ে দেওয়ার পর পাঁচ বারের বার এমন আঁটকে গিয়েছিলাম যে শেষ না করে ছাড়তে পারিনি। কেবল তাই না, বইটা শেষ হওয়ার পর স্বপ্ন দেখি শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়কে। তাও কি স্বপ্ন তিনি উদোম দাঁড়িয়ে আছেন শিশুর মতো। তাঁর স্ত্রী তাঁকে চান করিয়ে দিচ্ছেন বাচ্চা ছেলেকে যেভাবে মায়েরা স্নান করায়। আমি হঠাৎ সেখানে ঢুকে পড়ে আঁতকে উঠে বললাম, দাদা আপনি এই অবস্থায়। তিনি উত্তরে বিষন্নভাবে বলেছিলেন, ‘লেখা তো নিজেকে উলঙ্গ করা ছাড়া আর কিছু নয়। লেখকের কোন জামা কাপড় থাকে না জানিস!’ শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের নানান বইপত্রের ‘ভূমিকা’ আমাকে ভীষণভাবে লেখা দিকে ঠেলে দিয়েছিল। তিনি আমার পছন্দের লেখকদের একজন। নিজের লেখক বলি তাকে।

বইনিউজ : আপনার জীবনযাপন, চিন্তাধারা ইত্যাদি বদলে দেয়ার ক্ষেত্রে কোন বইয়ের অবদান রয়েছে কী? থাকলে সে ব্যাপারে আমাদের পাঠকদের বিস্তারিত জানান?

হামীম কামরুল হক : আমি একটা বইময় মানুষ। বই ছাড়া আমার দিনই আমি কল্পনাও করি না। বই আর আমি কেউ কাউকে বাদ দিয়ে একটা মুহূর্ত কাটাই না। একবার তো এর উত্তর দিয়েছি। যদিও সেটা প্রভাবের দিক থেকে। কত বই যে কত বার আমাকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল, তার তো ইয়ত্তা নেই। মার্কস-এঙ্গেলসের ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’, মার্কসের ‘মজুরি দাম মুনাফা’ এসব বই আমাকে সেই বয়সে যা হয়, সমাজবদলের চিন্তার দিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। পরে চিন্তাধারা বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে শিবনারায়ণ রায়ের ‘গণতন্ত্র, সংস্কৃতি ও অবক্ষয়’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বিচিত্র প্রবন্ধ’, আহমদ শরীফ ও আহমদ ছফার কিছু বই। আর সাহিত্যের ক্ষেত্রে হাসান আজিজুল হকের ‘কথাসাহিত্যের কথাকতা’, সৈয়দ হকের ‘মার্জিনে মন্তব্য ও গল্পের কলকব্জা’ স্মরণীয়। আর একান্ত ব্যক্তি-আমি দিক থেকে রজনীশের ‘সম্ভোগ থেকে সামাধির দিকে’ বইটা বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল। জীবনযাপনের সবক্ষেত্রে আমি বইয়ের কাছে ঋণী। গোর্কি বা কে যেমন এমন বলেছিলেন, ‘আমার ভালো-মন্দ সব কিছুর পেছনে আছে বই বই এবং বই।’ আমিও এটাই বলতে চাই। বই আমাকে কম বিভ্রান্ত করেনি, আবার ভ্রান্তি কাটিয়েও দিয়েছে বই-ই।

বইনিউজ : সম্প্রতি পড়েছেন এমন একটি ভালো বই সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা আমাদের পাঠকদের জানান?

হামীম কামরুল হক : রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী অনূদিত ইতালীয় লেখক আলেকসান্দ্রো বারিক্কো-র ‘সিল্ক’ বইটা আমাকে দ্বিতীয় পাঠে সম্প্রতিককালে একেবারে মাত করে দিয়েছে। আকারে একেবারেই ছোট্ট একটি বই, কিন্তু বিস্তারে হাজার পৃষ্ঠার বা কয়েক লক্ষ শব্দে লেখা বইয়ের চেয়েও শক্তিশালী। বোর্হেস উপন্যাস লিখলে এমন একটি বই লিখতেন, এটা এই দ্বিতীয় পাঠে স্পষ্ট হল। জীবন ও প্রেম, যতক্ষণ হাতের কাছে ততক্ষণ আমরা এর মূল্য দেই না। দুটোই যেন সিল্কের মতো গায়ে লেগে থাকে, কিন্তু টের পাই না। প্রেমের জন্য, জীবনের সমৃদ্ধির জন্য দুনিয়া দৌড়ে বেড়াই, কিন্তু নিজের সবচেয়ে মূল্যবান এই দুই বিষয় সব সময়ই আছে হাতের কাছে, যখন বোধটা আসে, ততদিন সময় ফুরিয়ে যায়। আলেকসান্দ্রো বারিক্কো-র ‘সিল্ক’ বইটা না পড়লে বলে বোঝানো মুশকিল এ বই কীভাবে কতটা গভীরভাবে কথাগুলি (লেখক কোথাও এটা না বলেলও) টের পাওয়ায়।