Home / বই আলাপ / আমি আদতে মনে মনে শবনম হতে চাইতাম-পাপড়ি রহমান

আমি আদতে মনে মনে শবনম হতে চাইতাম-পাপড়ি রহমান

pppবইপড়া আর নিজের প্রিয় বই নিয়ে বলেছেন কথাশিল্পী পাপড়ি রহমান।

 

বইনিউজ: প্রথম কোন বই পড়ে আপনি সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত হয়েছেন?
পাপড়ি রহমান: প্রথম যে বই পড়ে প্রভাবিত হয়েছিলাম তার স্মৃতি বেশ ঝাপসা। ক্লাস ফোরে পড়ার সময় টিফিনের টাকা জমিয়ে স্কুল লাগোয়া লাইব্রেরী থেকে কিনে ফেলি ধূসর গোধুলী। লেখক আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। বুঝতেই পারছেন নিজের টাকায় কেনা প্রথম বই। আহ কী যে অনুভূতি! তবে সে বইয়ের কিছুই তেমন করে স্মরণে নেই। পরবর্তীকালে শরৎচন্দ্রের দেবদাস পড়ে ব্যাপকভাবে বিষন্ন হয়ে পড়ি। এবং তা চিরস্থায়ী হয়ে যায়। মানে এখনো যতবার দেবদাস পড়ি, ততবারই কাঁদি আমি। কি করা? দেবদাসের ট্র্যাজিক পরিণতি আমি কিছুতেই মেনে নেতে পারিনা।

বইনিউজ: কোনো বই পড়ার পর সেই বইয়ের কোন চরিত্রের মতো হওয়ার বা তাকে অনুসরণ করার কী কখনো চেষ্টা করছেন? করে থাকলে পাঠকদের উদ্দ্যেশ্যে বিস্তারিত বলুন?
পাপড়ি রহমান: হাহাহা, সে কি আর বলতে? সৈয়দ মুজতবা আলীর শবনম যখন পড়ি তখন আমার ১৬/১৭ বয়স। ওই বইতে শবনমের আঁখির বর্ণনা পড়ে এতটাই বিমোহিত হয়ে পড়ি যে, আমি চোখে কাজলের বদলে সুরমা ব্যবহার করতে শুরু করি। আর আমার সহপাঠিনীরা তাক লেগে যায়। আমি ঘন করে সুরমা চোখে দিয়ে ঘুমাতাম। নীল বর্ণের সুরমা। আর সকালে উঠে কলেজে যেতাম। মেয়েরা ডেকে ডেকে বলত ‘এ্যাই তুমি চোখে কি দিয়েছ?’ আমি হাসতাম আর বলতাম—সুরমা। ওরা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত। কারণ তখন শুধু বুড়োরাই চোখে সুরমা ব্যবহার করত। কোনো তরুণী সুরমা দিয়েছে, এটা কেউই বিশ্বাস করতে চাইত না। আমি আদতে মনে মনে শবনম হতে চাইতাম। বা শবনমের মতো হতে চাইতাম। আমি শবনমের বলা অনেক কথাও কোট করতাম। যেমন আমার বিরহে যেন তুমি অভ্যস্ত হয়ে যেও না।

বইনিউজ: আপনার পঠিত বাংলা সাহিত্যের সেরা একটি উপন্যাস পড়ার মজার স্মৃতি পাঠকদের সাথে শেয়ার করুন।
পাপড়ি রহমান: বিপদে ফেলার মতো প্রশ্ন। কারণ সেরা উপন্যাস পড়ে মজার কোনো স্মৃতি তৈরি হয়নি। বরং বিষাদ তৈরি হয়েছে। সেটা কপালকুণ্ডলা থেকে শুরু করে আগুনপাখি। অলীক মানুষ থেকে শুরু করে হারবার্ট। গৃহদাহ থেকে শুরু করে খোয়াবনামা। বা যোগাযোগ থেকে শুরু করে আলকেমিস্ট। নয়নতারা থেকে শুরু করে আউটসাইডার। যে উপন্যাসই সেরা তাতে মজার চাইতে চিন্তা অধিক তৈরি হয়। আর চরিত্রগুলোর নানান ধরণ নিয়ে নিজের মাঝে বিক্ষেপ তৈরি হয়।

বইনিউজ: আপনার জীবনযাপন, চিন্তাধারা ইত্যাদি বদলে দেয়ার ক্ষেত্রে কোন বইয়ের অবদান রয়েছে কী? থাকলে সে ব্যাপারে আমাদের পাঠকদের বিস্তারিত জানান?
পাপড়ি রহমান: জীবনযাপন বদলে দেয়ার মতো উপন্যাস খুব কম পড়েছি।
তাছাড়া আমি চাইলেই কী কোনোদিন কপালকুণ্ডলা হতে পারতাম? ওই আজানুলম্বিত কেশগুচ্ছের অধিকারী। বা পোষাকবিহীন থাকা? বা সেই বন্য সরলতা? সেই করুণ পরিণতি? তবে অনেকদিন এমন ভেবেছি, আমি যাকে ভালোবাসি তার সাথে অমন করুণ পরিণতি হলে আমি সুখী হতাম। দয়িতের সাথে নিজেকে বিসর্জন দিতে পারলে বোধকরি জগতের শ্রেষ্ঠ কাজটি করা হতো। কিন্তু বাস্তব কিন্তু আমার ইচ্ছের অনুকুলে নয়। তবে আমি আজও নবকুমার ও কপালকুণ্ডলার জন্য বেদনা অনুভব করি।
যা কিছু যখনই পড়ি না কেন নানান চিন্তার উদ্রেক তো হয়ই। ছোটকালে পড়া আলবেয়ার কামুর আউটসাইডার সম্প্রতি ফের পড়ে বইটা নিয়া সর্বদাই ভাবছি। দেখুন কী অদ্ভূত চরিত্র! মায়ের মৃত্যুকে কেন্দ্র করেই কিন্তু তার যত অবসেশন। তারপরে ঘটনা কতদিকে মোড় নিল। সে যা করেছে নিজের বিষাদ কাটানোর জন্যই করেছে। মায়ের মৃত্যুর শূন্যতা ঢাকবার জন্যই সে নানান কিছুতে নিজেকে জড়িয়েছে। কিন্তু কে বুঝল সেসব? কেউনা। তার অন্তর্জগতের বিষয়াদি কেউ টেরই পেলনা। দেখুন সমাজ শুধুমাত্র বাইরের কাজকারবার নিয়েই ভাবে। ফলে সমাজের মানুষ ওইখানে আউটসাইডার। বা সমাজই আউটসাইডার। বা প্রধাণ চরিত্রটিই এই মেকি সমাজের জন্য আউটসাইডার। আদতে আমি বা আপনি যে কোনো ঘটনার জন্যই আউটসাইডার। তেমনি আমাদের যে কোনোকিছুর জন্যই অন্যেরা আউটসাইডার। এই বইটা নিয়ে দিনরাতই ভেবে মরছি। ফের নতুন করে ভাবছি।

বইনিউজ: সম্প্রতি পড়েছেন এমন একটি ভালো বই সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা আমাদের পাঠকদের জানান?
পাপড়ি রহমান: যদিও কিনেছিলাম বহু আগে, কিন্তু পরিবার ও সমাজ-সভ্যতার গ্যাড়াকলে পড়ে বইটি পড়ে উঠতে পারিনি। সম্প্রতি পড়ছি সেই বই, নাম ‘বাবুরনামা’। এটি সম্রাট বাবুরের অটোবায়োগ্র্যাফিক্যাল লেখা। অনুবাদ করেছেন প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ। বইটি দুই খণ্ডে সমাপ্ত। এটা ধরুন আজ থেকে ৬০০-৬৫০ বছর আগে লেখা। হিজরী ৮৯৯ সালে। লেখা হয়েছিল চাঘতাই তুর্কী ভাষায়। তা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন জন লেডেন ও উইলিয়াম এরসকীন। বইটাতে বাবুরের জীবনের নানান চৌম্বক অংশ সুলিখিতভাবে রয়েছে। তখনকার ভৌগলিক অবস্থা, খাদ্য, রাজনীতি, যুদ্ধ-বিগ্রহ, সবই ছোট ছোট নোট আকারে লিখিত আছে। বইটির পাণ্ডুলিপি সম্বন্ধে বলা হয়েছে যে, বাবুরের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে হুমায়ূন এ স্মৃতিকথার নকল আমৃত্যু করে যান। পরবর্তীতে ওই পাণ্ডুলিপি ফার্সি ভাষায় অনুদিত হয়। আদতে এ বইটি এক তাতার বাদশার মূল্যবান জীবন চিত্রন। যাতে বাবুরের জীবনের নানান খুঁটিনাটি বিধৃত হয়েছে। প্রায় ৬৫০ বছর আগের জীবন, একেবারে করতলে রেখে দেখতে পেলে যে কাউকেই আপ্লুত করবে বইকি।