Home / বই আলাপ / ‘লিলিপুটরা বড় হবে’ অনেক ছোটবেলায় পড়েছিলাম কিন্তু…। আবিদুল ইসলাম

‘লিলিপুটরা বড় হবে’ অনেক ছোটবেলায় পড়েছিলাম কিন্তু…। আবিদুল ইসলাম

 

book-123বইপড়া আর নিজের প্রিয় বই নিয়ে বলেছেন লেখক আবিদুল ইসলাম

 

বইনিউজ: প্রথম কোন বই পড়ে আপনি সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত হয়েছেন?

আবিদুল ইসলাম: মঈনুল আহসান সাবেরের ‘লিলিপুটরা বড় হবে’। অনেক ছোটবেলায় পড়েছিলাম কিন্তু কাহিনীটি মনে দাগ কেটেছিল বলে এখনো মনে আছে। একটি মফস্বল শহরের এক স্কুলের ছাপোষা শিক্ষক ক্লাসে ছেলেমেয়েদের ‘গালিভার্স ট্রাভেলসে’র গল্প বলতেন। এরপর থেকে সেই শিক্ষকের নাম হয়ে গেল ‘লিলিপুট স্যার’। ছাত্ররা তাকে সেই নামেই ডাকত। একদিন সেই স্যারের এক ছোট ছেলে স্থানীয় প্রভাবশালী এক ব্যক্তির গাড়িচাপা পড়ে মারা যায়। অন্যায়ভাবে গাড়িচাপা দিয়ে তাকে মেরে ফেলার জন্য যাতে লোকটার উপযুক্ত শাস্তি হয় সে জন্য দরিদ্র সেই শিক্ষক থানা-পুলিশ, আইন-আদালত করেছিলেন নিজের সাধ্যমতো। কিন্তু প্রতাপশালী সেই ব্যক্তি এলাকায় নিজের অন্যায় প্রভাব ব্যবহার করে শাস্তি থেকে পার পেয়ে যায়। এরপর ঐ শিক্ষক মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন এবং ছাত্রদের মধ্যে যাকেই পেতেন তাকে বলে বেড়াতেন, দেখো, লিলিপুটরা একদিন বড় হবে। সহজ-সরল শিশুদের উপযোগী গল্প, কিন্তু তার মধ্যে সমাজচেতনা আছে, বর্তমান সমাজব্যবস্থার চিত্র আছে, এই অন্যায় ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার আকাঙ্ক্ষা আছে।

বইনিউজ: কোনো বই পড়ার পর সেই বইয়ের কোন চরিত্রের মতো হওয়ার বা তাকে অনুসরণ করার কী কখনো চেষ্টা করছেন? করে থাকলে পাঠকদের উদ্দেশ্যে বিস্তারিত বলুন?
আবিদুল ইসলাম: এমন কোনো চরিত্র মনে পড়ছে না। তবে নিকোলাই অস্ত্রভস্কির ‘ইস্পাত’ উপন্যাসের পাভেল করচাগিনের চরিত্রটি মনে দাগ কেটেছিল। তবে তার মতো হওয়ার দুঃসাহস কখনো হয় নি।

il-book

বইনিউজ: আপনার পঠিত বাংলা সাহিত্যের সেরা একটি উপন্যাস পড়ার মজার স্মৃতি পাঠকদের সাথে শেয়ার করুন।

আবিদুল ইসলাম: এই অভিজ্ঞতা মনে হয় অনেকেরই হয়েছে। বেশ কয়েক বছর আগে আমার খালাকে নিয়ে পটুয়াখালিতে মামাবাড়িতে বেড়াতে যাই। আমার সাথে তখন ছিল আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’। একদিন মামার বাসায় বিছানায় শুয়ে শুয়ে বইটি পড়ছি। একসময় লক্ষ্য করলাম আমার সমবয়সী মামাতো ভাই অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে এবং মনে হলো কিছু বলতে চাইছে। আমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে তার বিস্ময় প্রকাশ করল, ‘তুমি এই বই পড়ছ?’ আমি বললাম, কেন সমস্যা কী? সে ইতস্তত করে বলল, ‘না, মানে … আমি তো জানতাম তুমি এইসব বিশ্বাস-টিশ্বাস করো না।’

বইনিউজ: আপনার জীবনযাপন, চিন্তাধারা ইত্যাদি বদলে দেয়ার ক্ষেত্রে কোন বইয়ের অবদান রয়েছে কী? থাকলে সে ব্যাপারে আমাদের পাঠকদের বিস্তারিত জানান?

আবিদুল ইসলাম: নির্দিষ্টভাবে তো একটা বইয়ের কথা বলতে পারব না। বিষয়টা তো এমন নয় যে হঠাৎ করে একটা বই পড়ে চিন্তাভাবনা আমূল বদলে গেল। এটা দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক একটা প্রক্রিয়া। আমার ছোটবেলা কেটেছে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায়, শিবরাম চক্রবর্তী এদের বই পড়ে। এরপর আরো পড়েছি বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ আর শরৎচন্দ্র। মাঝে হুমায়ূন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল ছাড়াও মাসুদ রানা সিরিজ, তিন গোয়েন্দা সিরিজ সহ সেবা প্রকাশনীর বই পড়া হয়েছে কিছু। এগুলো তো সবই ফিকশন, কিন্তু সেগুলোও কিছু কিছু চিন্তা গঠনে অচেতনভাবে প্রভাব ফেলেছিল অবশ্যই। প্রথম যৌবনে হুমায়ুন আজাদ আর আরজ আলী মাতুব্বরের বই পড়ে প্রভাবিত হয়েছিলাম। আর রাজনীতি কিংবা রাজনৈতিক অর্থনীতি বিষয়ে চিন্তার ক্ষেত্রে বদরুদ্দীন উমর, আনু মুহাম্মদ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আহমদ শরীফ, আবুল কাসেম ফজলুল হক, সুপ্রকাশ রায়, সুনীতি কুমার ঘোষ, অরুন্ধতী রায়- এদের অবদান অস্বীকার করতে পারি না। আর রাজনৈতিক চিন্তার তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণে মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্ট্যালিন, মাও- এদের যতো বই পড়া হয়েছে, তার সব কয়টিরই রয়েছে সুনির্দিষ্ট ভূমিকা।

বইনিউজ: সম্প্রতি পড়েছেন এমন একটি ভালো বই সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা আমাদের পাঠকদের জানান?
আবিদুল ইসলাম: খুব দেরিতে হলেও পড়েছি লুইস হেনরি মরগ্যানের ‘এনসিয়েন্ট সোসাইটি’। মূলত এঙ্গেলসের ‘অরিজিন অব দ্যা ফ্যামিলি, প্রাইভেট প্রপার্টি অ্যান্ড স্টেট’ পড়ার পর থেকেই ঐ বইটি পড়ার বাসনা পোষণ করছিলাম। মানবসভ্যতার ইতিহাস যে কমবেশি বিকাশের অভিন্ন ধারায় প্রবাহিত হয়েছে এবং সময় ও স্থানের স্বাতন্ত্র্য ও দূরত্ব সত্ত্বেও যে মানবসভ্যতার অভিজ্ঞতা অনেকটা একই পথরেখা ধরে এগিয়েছে এই বিষয়ে চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রে বইটি সাহায্য করেছে অনেক। আমি মানুষ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী অন্যদেরকেও এই বইটি পড়ে দেখার অনুরোধ করব। মানুষের চিন্তার দিগন্তকে বিস্তৃত করতে বইটি সাহায্য করবে অনেক।