Home / বই আলাপ / ‘শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘জীবন-রহস্য’ পড়ে মুগ্ধতায় আপ্লুত হয়েছি’ – অঞ্জন আচার্য

‘শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘জীবন-রহস্য’ পড়ে মুগ্ধতায় আপ্লুত হয়েছি’ – অঞ্জন আচার্য

 

Anjon-Acharyaবইপড়া আর নিজের প্রিয় বই নিয়ে বলেছেন কবি সাংবাদিক অঞ্জন আচার্য

বইনিউজ : প্রথম কোন বই পড়ে আপনি সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছেন?

অঞ্জন আচার্য : কৈশোর-উত্তীর্ণ তারুণ্যে আমাকে ভীষণ রকম আন্দোলিত করেছিল সমরেশ মজুমদারের ‘কালবেলা’ বইটি। নিজেকে সেসময় অনিমেষ ভাবতে ভালো লাগতো। জলপাইগুড়ির চা-বাগানে ঘুরে বেড়াতে ইচ্ছে করতো খুব। বিপ্লবী হতে মন চাইতো। আর ছিল মাধবীলতা। ওহ! তার কথা কি বলবো? এক মাধবীলতাকে পাওয়ার স্বপ্নে কত দিন-রাত একাকার করেছি! অনিমেষ হয়ে তার হাত ধরে কত পথ হেঁটেছি রাতঘুমে কিংবা দিবাস্বপ্নে। তার প্রেমে এতটাই বিভোর ছিলাম যে, তা এক-দুই কথায় শেষ হবার নয়। কত শত নারীর চোখে খুঁজে বেরিয়েছি মাধবীলতাকে, পাইনি। রক্তমাংসের মাধবীলতাদের পাওয়া যায় না এই বাস্তবিক জীবনে। তাদের জন্মই হয় অধরাই থাকবে বলে।
একবার দৈনিক ইত্তেফাকের হয়ে ঢাকায় বসে সমরেশ মজুমদারের একটি সাক্ষাৎকার নেয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। নির্ধারিত প্রশ্নাবলীর পর একসময় দীর্ঘদিন ধরে মনে জমে থাকা অব্যক্ত কথাটি জিজ্ঞাসা করে বসলাম স্বয়ং লেখককে : ‘আচ্ছা, মাধবীলতা কি আপনার চেনাজানা কোনো নারীর প্রতিচ্ছবি?’ সমরেশ দা মৃদু হেসে বললেন, না, এটা তাঁর একক কোনো নারী চরিত্র নয়; তাঁর দেখা অনেক নারীর নির্যাস দিয়ে গড়া এক কাল্পনিক চরিত্র মাত্র। মুহূর্তেই মনটা দমে গেল। কোথায় ভাবলাম, চেনা কেউ হলে একবার চোখের দেখা দেখে আসতাম ভালোবাসার সেই মানুষটিকে। হয়তো ওই বয়সে বৃদ্ধাই হয়ে পড়তেন তিনি, তবুও…। ওই বৃদ্ধাকেই বরং ভালোবাসা প্রোপোজ করে আসতাম!

a-b
বইনিউজ : কোনো বই পড়ার পর সেই বইয়ের কোনো চরিত্রের মতো হওয়ার বা তাকে অনুসরণ করার কী কখনো চেষ্টা করছেন? করে থাকলে পাঠকদের উদ্দ্যেশ্যে বিস্তারিত বলুন?

অঞ্জন আচার্য : বইয়ে পড়া চরিত্র হওয়ার চেষ্টা কি বলবো, রীতিমতো নিজেকে তা-ই ভাবতাম। নিকোলাই অস্ত্রভস্কি’র ‘ইস্পাত’ বইয়ের পাভেল করচাগিন, এ যেন আমি-ই ছিলাম। আমার ডাক নাম রুবেল। পাভেল নামের সঙ্গে কাকতালীয়ভাবে যার ছিল ছন্দগত মিল। রুবেলকে পাভেলে রূপান্তর করতে চেয়েছিলাম একসময়, পারিনি। জীবন অনেক কিছুই দেয় হয়তো। কেড়েও কম নেয় না। হতে চাইলেই কি হওয়া যায় সব কিছু? মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানদের স্বপ্নই তো সবচেয়ে বড় সম্পদ। ‘ইস্পাত’-এর সেই কথাগুলো আজো মনে পড়ে- “জীবন মানুষের সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ। এই জীবন সে পায় মাত্র একটি বার। তাই, এমনভাবে বাঁচতে হবে যাতে বছরের পর বছর লক্ষ্যহীন জীবনযাপন করার যন্ত্রণাভরা অনুশোচনায় ভুগতে না হয়, যাতে বিগত জীবনের গ্লানিভরা হীনতায় লজ্জার দগ্ধানি সইতে না হয়, এমনভাবে বাঁচতে হবে যাতে মৃত্যুর মুহূর্তে মানুষ বলতে পারে : আমার সমগ্র জীবন, সমগ্র শক্তি আমি ব্যয় করেছি এই দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আদর্শের জন্য- মানুষের মুক্তির সংগ্রামে।” সেইসব কথা জীবনে ধারণ করে বহন করতে আর পারলাম কই? মানুষের মুক্তির সংগ্রামে আমি এক ব্যর্থ যোদ্ধা।
বইনিউজ : আপনার পঠিত বাংলা সাহিত্যের সেরা একটি উপন্যাস পড়ার মজার স্মৃতি পাঠকদের সাথে শেয়ার করুন।
অঞ্জন আচার্য : আমার পঠিত উপন্যাসটি যে বাংলা সাহিত্যের সেরা হবে, এমনটা নাও হতে পারে কারো কাছে। সেরার মানদণ্ডটি তো আসলে আপেক্ষিক। তো যাই হোক, ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকি করতে জানতাম। স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে বড় চিত্রশিল্পী হওয়ার। তখন এইচএসসি পড়ি। পাস করার পর ভর্তি হবো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায়। সেসময়ের কোনো এক ছুটির দিনে বেড়াতে গিয়েছি কিশোরগঞ্জে পিসির বাড়িতে। সেখানে হঠাৎ আমার মাথায় ভূত চাপলো ডাক্তার হওয়ার। তার পেছনে ইন্ধন জুগিয়েছিল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ বইটি। ওটা পড়ার পর শশীর মতো ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছে জাগলো, শহর থেকে ডাক্তারি পাস করে গ্রামে গিয়ে চিকিৎসাসেবা দেবো। ডাক্তারি পড়ার বাতিক উঠেছিল এমনই যে, মাকে বললাম, ‘মা, আমি ডাক্তার হবো।’ মা শুনে চক্ষু কপালে! ছেলে বলে কি? ‘তোর না চারুকলায় পড়ার ইচ্ছা, হঠাৎ ডাক্তার হতে চাচ্ছিস যে?’ মা তো ভেবেই পায় না, ছেলেকে আবার ডাক্তার হওয়ার রোগে ধরলো কেন? নিশ্চয়ই আমার মাথা নষ্ট হয়ে গেছে। রীতিমতো ডাক্তার ডাকার উপক্রম হলো আমার জন্য। তার পরেও কোনো কথাই শুনতে রাজি নই আমি। ডাক্তার আমাকে হতেই হবে। না হলে এ জীবন ব্যর্থ। এসএসসি ও এইচএসসিতে সায়েন্স নিয়ে পড়ছি কি সাধে? ভাগ্যিস নেহাত সায়েন্স ছিল, আর্টস পড়ে ডাক্তার হতে চাইনি। এক উপন্যাস হঠাৎ আমার চিত্রশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন ভণ্ডুল করে দিলো, পাগল করে তুললো ডাক্তার হওয়ার জন্য, সে খবর কি আর মায়ের আছে? তবে সেই পাগলামির স্থায়িত্ব বেশি দিন টেকেনি। শুনেছি, ডাক্তারি পড়তে গেলে নাকি কঠিন কঠিন বই পড়তে হয়, মোটা মোটা বইয়ে মুখ গুজে থাকতে হয় সারাদিন। জটিল জটিল সব শব্দ মাথায় রাখতে হয় বলে, একসময় ডাক্তার হওয়ার বাসনাটা শেষমেশ মাথা থেকেই উধাও হয়ে গেল। কালের আবর্তে বিলীন হয়ে গেল ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন। মনে মনে কানে ধরেছি, ওই উপন্যাস আর পড়বো না। এদিকে চারুকলায় চান্স না পাওয়ায় ভেস্তে গেল চিত্রশিল্পী হওয়াও। বহুদিন পর বাংলায় মাস্টার্স পড়ার সময় মানিকের ওই উপন্যাসটি আমাদের পড়তে হয়েছিল। সেইবার সেটি পড়ছিলাম, আর মনে মনে হাসছিলাম। কি নাজেহালেই না করেছিল বইটি আমাকে!
বইনিউজ : আপনার জীবনযাপন, চিন্তাধারা ইত্যাদি বদলে দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো বইয়ের অবদান রয়েছে কী? থাকলে সে ব্যাপারে আমাদের পাঠকদের বিস্তারিত জানান?

অঞ্জন আচার্য : তখন ময়মনসিংহ পাবলিক লাইব্রেরিতে সারাদিন পড়ে থাকতাম বইয়ে মুখ গুজে। কলেজ ফাঁকি দিয়ে লাইব্রেরিতে সময় কাটাতাম। মা ভাবতো, ছেলে আমার কতই না পড়াশুনা করছে। পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কী বই যে সেসময় পড়তাম, তা কি আর মা জানতো? সিলেবাসের বইয়ের সূচিটাও ভালো করে জানা ছিল না। তবে গোগল, চেখভ, তলস্তয় থেকে সুনীল, শীর্ষেন্দু, সমরেশ কে কী লিখেছেন, তা ছিলে একেবারে নখদর্পণে। যাই হোক, একদিন এক সন্ধ্যায় লাইব্রেরি’র এক পাঠক-বন্ধু বললো, প্রবীর ঘোষের ‘অলৌকিক নয় লৌকিক’ বইটি পড়লে নাকি অনেক জাদু শেখা যায়। জাদুবিদ্যার প্রতি ছেলেবেলা থেকেই আমার ছিল অগাধ কৌতূহল। এখনও তাই। তো, সেই জাদু শিখবো বলে পরের দিন বিকালেই গিয়ে হাজির হলাম দুর্গাবাড়ির লাইব্রেরিতে। বইটির পাঁচটি খণ্ড। তাদের সংগ্রহে ছিল তিনটি। ওই তিনটি বই পড়ে বেশ কিছু জাদু শিখলাম বটে, তবে সেই সাথে অনেক কিছু জানতেও পারলাম। ভূতে মারাত্মক ভয় পেতাম একসময়, সেটা কেটে গেল বইটির দ্বিতীয় খণ্ড পড়ে। ঝাড়ফুক, ওমুক-পড়া তমুক-পড়া’র গুমোরও জানতে পারলাম। তৃতীয় খণ্ড পড়ে জ্যোতিষীদের হাত দেখা কী জিনিস তা বুঝলাম অস্থিমজ্জাসহ। জ্যোতিষশাস্ত্র কতখানি ভুয়া একটি বিষয়, ওই বই না পড়লে হয়তো জানতেই পারতাম না কোনোদিন। বেশ কিছু কুসংস্কার ছিল মনে, সেগুলো কাটিয়ে দিলো ওই সিরিজের বইগুলো। মনোবিজ্ঞান আমার প্রিয় বিষয়। ওই বইগুলো সেটাও মেটালো। হিস্টেরিয়া, ম্যানিয়াক ডিপ্রেসিভ, সিজোফ্রেনিয়া, নানা রকম ফোবিয়া ও হেলোসিনেশনসহ বিভিন্ন মনোরোগ সম্পর্কেও বিস্তারিত জানতে পারলাম গল্পের ছলে। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার উপস্থিতি আছে ‘অলৌকিক নয় লৌকক’ বইটিতে। বস্তুত অলৌকিকতার প্রশ্নটি লেখক আর্থ-সামাজিক, সমাজ-সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক, মনোস্তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ইত্যাদি বিভিন্ন দিক থেকে বিচার করেছেন। আমার সীমাবদ্ধ চিন্তাকে প্রথম প্রসারিত হওয়ার জন্য ধাক্কা দিলো ‘অলৌকিক নয় লৌকিক’।

বইনিউজ : সম্প্রতি পড়েছেন এমন একটি ভালো বই সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা আমাদের পাঠকদের জানান?

অঞ্জন আচার্য : শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের আত্মজীবনী ‘জীবন-রহস্য’ বইটি পড়ে মাথাই খারাপ হওয়ার জোগার! এভাবেও কেউ লিখতে পারে? পড়তে পড়তে রীতিমতো থো মেরে গেছি। কি নির্মম ঘটনা নিয়ে কি নির্জলা রসিকতা। ভাবতেই অবাক লাগে! হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরার জোগার। তবে সে বিষয়টি হাস্যরসের মধ্য দিয়ে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় উপস্থাপন করলেন, তা মোটেই কোনো হাসির বস্তু ছিল না; ছিল রূঢ় বাস্তবতা। এ যেন বুক ফেটে যায় কান্নায়, তো পেট ফেটে যায় হাসিতে।
জীবন এক অনন্য-সুন্দর অসমাপ্ত উপন্যাস। মৃত্যুর চোখে নয়; বরং জীবন-বাস্তবতায় তাকে পাঠ করে নিতে হয় অনন্ত জীবনের চোখে। ‘জীবন-রহস্য’ পড়ে মুগ্ধতায় আপ্লুত হয়েছি। আর মগ্নতায় ডুবে ডুবে এই প্রথম কোনো বই আবারো পড়বার ইচ্ছে পোষণ করে রেখেছি মনে মনে। বইটিকে ‘অসাধারণ’ বললেও মনে হয় কম বলা হবে। এ বইয়ের কোনো বিশেষণ নেই আমার কাছে।