Home / বই আলাপ / ইভান, তাতিয়ানা আমার কাছে খুব আপন হয়ে উঠতো-মালেকা পারভীন

ইভান, তাতিয়ানা আমার কাছে খুব আপন হয়ে উঠতো-মালেকা পারভীন

book-6বইপড়া আর নিজের প্রিয় বই নিয়ে বলেছেন কবি-কথাশিল্পী মালেকা পারভীন

বইনিউজ :  প্রথম কোন বই পড়ে আপনি সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত হয়েছেন?

মালেকা পারভীন: অক্ষর চিনে নিজে নিজে বই পড়তে শুরু করার অনেক আগে থেকেই বইয়ের সাথে বন্ধুত্ব।বোধ-বুদ্ধি হবার পর থেকেই চোখের সামনে চাকুরিজীবি আব্বার বই-ভর্তি আলমারি দেখে দেখে বড় হয়েছি। আজ সেই সমৃদ্ধ সংগ্রহের কথা ভেবে যেমন শিহরিত হই,তেমনি গর্ববোধ করি।বই পড়ে প্রথম সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হওয়ার ব্যাপারটা ঘটে সম্ভবত ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণীতে পড়াকালীন স্কুলের কোন টার্মের পরীক্ষার অবসরে যখন আমি প্রথম বারের মতো ম্যাক্সিম গোর্কির তিন খন্ডের আত্ম-জীবনীমূলক বইগুলো পড়ে শেষ করি।বইগুলোর নাম ছিল আমার ছেলেবেলা,পৃথিবীর পথে এবং পৃথিবীর পাঠশালায়।মস্কোর প্রগতি প্রকাশন থেকে ঝরঝরে বাংলায় প্রকাশিত অদ্ভূত সুন্দর নামের বইগুলো আমার কিশোর মনে ভীষণভাবে দাগ কেটে যায়।কাছাকাছি বয়সের হওয়াতে কাহিনীর নায়ক আলিওশার সাথে, তার জীবন-যন্ত্রণা ও জীবন-পথে অর্জিত অমূল্য অভিগ্গতার সাথে এক ধরনের মানসিক নৈকট্য তৈরি হয়ে যায়। এর পরপরই আমি রাশান সাহিত্যের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ি। সেই দুর্বলতা আজও অটুট আছে।

বইনিউজ : কোনো বই পড়ার পর সেই বইয়ের কোন চরিত্রের মতো হওয়ার বা তাকে অনুসরণ করার কী কখনো চেষ্টা করছেন? করে থাকলে পাঠকদের উদ্দ্যেশ্যে বিস্তারিত বলুন?

মালেকা পারভীন: আমার আগের উত্তরে এর কিছুটা ইঙ্গিত আছে। তবে বই পড়ে এককভাবে কোন বিশেষ চরিত্রের মতো হওয়ার ইচ্ছা না হলেও আমার ক্ষেত্রে অল্প বয়সে যেটা হয়েছিল, আমি আমার পছন্দের চরিত্রগুলোর নামের ভীষণ ভক্ত হয়ে যেতাম। এ কারণে রাশান সাহিত্যের কমন নামগুলি যেমন- আলিওশা বা আলেক্সেই, শাশা বা মাশা, ইভান, তাতিয়ানা আমার কাছে খুব আপন হয়ে উঠতো। আর একটা ব্যাপার ঘটতো, আত্মজীবনী-সংক্রান্ত বা ভ্রমণ-কাহিনী জাতীয় কোন বই পড়তে থাকলে স্বপ্ন দেখতাম, একদিন বড় হলে বইয়ের ওই বিশেষ চরিত্রটার সাথে দেখা করে আসবো।মনে পড়ে, স্কুলে থাকতে পল্লীকবি জসীম্ জসীম উদ্দীনের তৎকালীন যুগোস্লাভিয়া ভ্রমণের ওপর লেখা অসাধারণ বই ‘হলদে পরীর দেশে’ পড়ে আমি ভেতরে ভেতরে খুব অস্থির হযে পড়েছিলাম।কারণ সেই বইয়ের কিছু চরিত্র আমাকে দারুণভাবে আন্দোলিত করেছিল, আর বইটিতে বর্ণিত শিশুরাজ্যটির কথা জেনে কোন একদিন সেখানে ‘যাবই যাব’ মনস্থির করে ফেলেছিলাম!

book-9
বইনিউজ : আপনার পঠিত বাংলা সাহিত্যের সেরা একটি উপন্যাস পড়ার মজার স্মৃতি পাঠকদের সাথে শেয়ার করুন।

মালেকা পারভীন: বাংলা সাহিত্যের সেরা একটি উপন্যাস পড়ার মজার স্মৃতি প্রসঙ্গে আমার ব্যক্তিগত অভিগ্গতা একটু ভিন্নরকম। আগেই যেমনটা বলেছি, ক্লাস সিক্স অথবা সেভেন থেকেই আমার বই পড়ার নেশাটা খানিকটা সর্বভুক হয়ে ওঠে। সর্বভুকের ব্যাপারটা প্রধানত গল্প বা উপন্যাসকেন্দ্রিক অর্থাৎ ফিকশন (যদিও ফিকশন শব্দটার সাথে পরিচয় ঘটেছে আরো অনেক পরে যখন আমি ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে অনার্স পড়ছি।)তো হাতের কাছে যা পাই তাই পড়ি। ইতিমধ্যে রবীন্দ্রনাথের ‘গল্পগুচ্ছ’ পড়ে শেষ করেছি এবং ভীষণভাবে আলোড়িত হয়েছি। সেই অল্প বয়সেই।এখন কী পড়া যায়? বারবার চোখ চলে যায় বইয়ের আলমারির ভেতরে সবুজ মলাটের বঙ্কিম রচনাবলীর উপন্যাসসমূহের দিকে।এত মোটা বই কি পড়তে পারবো? বঙ্কিমের উপন্যাসসমগ্র আর তার পাশাপাশি থাকা বাইবেলের বাংলা অনুবাদের লাল রঙের মোটা বইটার সাথে কেবল তাদের বিশাল আকারের কারণে আমার একটা প্রাথমিক জড়তা বা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। যা হোক, গল্প পড়ার নেশার কারণেই একসময় সেই দূরত্ব ঘুচে যায়।ছোট হাল্কা হাতে তুলে নিই ওজনদার বঙ্কিমের উপন্যাসসমগ্র।গোগ্রাসে গিলতে থাকি (প্রায় আক্ষরিক অর্থে) ‘কপালকুন্ডলা’, ‘দুর্গেশনন্দিনী’, ‘কৃষ্ঞকান্তের উইল’, ‘রজনী’, ‘বিষবৃক্ষ’ সহ সবকটি উপন্যাস।এখন এসব বলতে গিয়ে মনে পড়ছে, বিশেষ করে ‘রজনী’ উপন্যাসটির নামচরিত্রটির জন্য প্রথমদিকে ভীষণ মন খারাপ হয়েছিল।কারণ সে ছিল এক গরীব ঘরের জন্মান্ধ নারী।কাহিনীর শেষে অবশ্য রুপকথার মতো একটা পরিণতি আছে।পরে জেনেছি, বৃটিশ রাজনীতিবিদ এবং ঔপন্যাসিক লর্ড এডওয়ার্ড বুলওয়ার-লিটন এর বিখ্যাত উপন্যাস ‘লাস্ট ডেইজ অব পম্পেই’ এর অন্যতম প্রধান নারী চরিত্র অন্ধ ফুল-বিক্রেতা নিডিয়ার ওপর ভিত্তি করে বঙিকম তাঁর রজনী উপন্যাসের প্রধান চরিত্রটি নির্মাণ করেছেন। তো, এরকম সাহিত্য-ভিত্তিক পটভূমি/তথ্য, বিভিন্ন বইয়ের বিভিন্ন চরিত্রের জন্য ভালো লাগা,মায়া বা ঘৃণা অনুভবের বিষয়টা আমার কাছে সবসময়ই অন্যরকম এক আনন্দময়/কৌতুহলোদ্দীপক প্রাপ্তি বলে মনে হয়, যেটা আমি আর অন্য কিছু থেকে পাইনা।একটা বই পড়তে পড়তে লেখকের একটি কল্পিত চরিত্রের সাথে হেসে উঠছি, তার জন্য কাঁদছি অথবা ভাবছি সে এতো খারাপ কেন-ব্যাপারগুলো সত্যিই সবটুকু ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে।

বইনিউজ : আপনার জীবনযাপন, চিন্তাধারা ইত্যাদি বদলে দেয়ার ক্ষেত্রে কোন বইয়ের অবদান রয়েছে কী? থাকলে সে ব্যাপারে আমাদের পাঠকদের বিস্তারিত জানান?

মালেকা পারভীন: এই প্রশ্নের উত্তরে আমি প্রথমেই যা বলতে চাই তা হচ্ছে, জন্মসূত্রে পাওয়া বই পড়ার অভ্যাসটি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া। জন্মসূত্রে বলছি এ কারণে যে, এই অসাধারণ গুণটি আমি প্রধানত আমার আব্বার কাছ থেকে পেয়েছি যিনি একসময় সরকারি চাকুরির সীমিত বেতনের একটা    নির্দষ্ট অংশ ব্যয় করতেন বই কেনার পেছনে। যা হোক, বইবিহীন একটি দিন আমার কল্পনার বাইরে।আমার দৈনন্দিন জীবনযাপনের কিছু অপরিহার্য বাস্তবতার একটি হলো কিছু না কিছু পড়া; এটা অবশ্য দিনের পত্রিকা বা লাইফ স্টাইলের কোন মাসিক পত্রিকা পড়া অর্থে নয়। কোন বইয়ের কিছু অংশ পড়া, কখনো কখনো যা পড়লাম তা নিয়ে কিছু চিন্তা করা ইত্যাদি। আমার জীবনযাপন, চিন্তাধারা ইত্যাদি বদলে দেয়ার ক্ষেত্রে এককভাবে বিশেষ কোন বইয়ের অবদানের কথা আমি বলতে চাইনা। বরং সামগ্রিকভাবে বই পড়ার অভ্যাসটাই আমার জীবন ও মানুষ সম্পর্কে ধারণাকে, জীবন ও জগতের বাস্তবতাকে উপলব্ধি/গ্রহণ করতে, নিজের জন্য প্রয়োজনীয় আলাদা ভুবন তৈরি করে নিতে প্রতিনিয়ত ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।আমার ভীষণ ব্যস্ত একটি পেশাগত জীবন আছে; সেখানে আমাকে অন্যান্য আরো অনেকের মতো নানা ধরনের প্রতিকূলতা/চ্যালেঞ্জ এর মুখোমুখি হতে হয়। ঘরে ফিরে গৃহস্থালির সব কাজ শেষ করে আমি যখন কোন বইয়ের ভেতরে ডুবে যাই, জগতের আর কোন ক্লেদ বা ক্লান্তি আমাকে তখন আর স্পর্শ করেনা।আমার জীবনযাপন এবং ভাব ও ভাবনার নির্মাণে বই বা বই পাঠের অবদানের কথা এত সংক্ষিপ্ত পরিসরে বলা সম্ভব নয়।এক কথায়,অপরিমিত অবদান।এ প্রসঙ্গে একটা কথা না বলে পারছিনা।আমি যখন এ যুগের ছেলেমেয়েদের একটা বিরাট অংশকে স্মার্টফোন, ফেসবুক আর হোয়াটস-অ্যাপের পেছনে অযথা সময় নষ্ট করতে দেখি(এগুলোর প্রয়োজনীয়তা এবং যথোপযুক্ত ব্যবহারের কথা মাথায় রেখে বলছি), ওদের জন্য আমার খুব কষ্ট হয় এই ভেবে যে, বই পড়ার যে স্বর্গীয় অনাবিল আনন্দ তা থেকে কী দুভার্গ্যজনকভাবেই না তারা নিজেদের বঞ্তি করছে!এর মধ্যেও যখন হাতে-গোনা কয়েকজন ছেলেমেয়েকে বই পড়তে দেখি, তখন সত্যিই ভালো লাগে।

বইনিউজ : সম্প্রতি পড়েছেন এমন একটি ভালো বই সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা আমাদের পাঠকদের জানান।

মালেকা পারভীন: সমসাময়িক বিশ্ব-সাহিত্যে যে কজন লেখকের নাম ঘুরে-ফিরে আসে, তুরস্কের ওরহান পামুক তাঁদের অন্যতম । আমি তাঁর লেখার ভীষণ ভক্ত। একটি বৃহৎ পরিবার, একটি ঐতিহাসিক শহর বা একটি গোটা দেশের ভাঙ্গা-গড়ার অভূতপূর্ব বয়ান; দূরাগত স্মৃতি, একাকিত্ব বা নিসঙ্গতার মতো চিরন্তন মানবিক অনুভূতির বিষয়গুলো যে চমৎকার ভাষা ও শব্দচয়নে তাঁর বিভিন্ন বিখ্যাত উপন্যাসগুলিতে ফুটে উঠতে দেখি তা এক কথায় অপূর্ব! সম্প্রতি আমি পামুকের ‘ইস্তানবুল: মেমোরিজ এন্ড দ্য সিটি’ নামের উপন্যাসটি পড়ে শেষ করেছি। এ টিপিক্যাল পামুক নভেল। বলতে গেলে বইটা পড়ার পুরো সময়টাই একটা ঘোরের ভেতর আচ্ছন্ন ছিলাম। বলাবাহুল্য, লেখকের জন্ম-শহর ইস্তানবুল উপন্যাসের প্রধান চরিত্র। সাধারণ ইস্তানবুলবাসিদের মনোজগতের অন্তির্নিহিত চরিত্রজাত ‘হুজুন’ বা বিষন্নতা বোধে আক্রান্ত স্মৃতিচারণের মাধ্যমে নাম শহরটির চরিত্র চিত্রন করেছেন লেখক এবং এর মধ্য দিয়ে তিনি মূলত নিজের ব্যক্তিগত জীবনের কথাগুলোই বলে গেছেন,বলেছেন কিভাবে শেষ পর্যন্ত নিজের সংকল্পে স্থির থেকে তিনি শিল্প এবং সাহিত্যের বেদিমূলে তাঁর অনিশ্চিত জীবনটাকে সঁপে দিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে বইটির সর্বশেষ অধ্যায়, ‘এ কনভারসেশন উইথ মাই মাদার : পেশেন্স,কশান এন্ড আর্ট’- এর কথা আমি বিশেষভাবে বলতে চাই। এখানে পামুক আমাদের জানাচ্ছেন, জীবনের রুঢ় বাস্তবতাজাত কতরকম যুক্তির অবতারণা করেই না তাঁর মা তাঁকে শিল্প-সাহিত্যের জীবন বেছে নেওয়ার পথ থেকে ফেরাতে চেয়েছিলেন ! কিছু কিছু স্থানের পুনরুক্তিমূলক একঘেয়েমি ছাড়া গোটা বইটাই অসাধারণ ! শেষের অধ্যায়টি ‘এ স্মল পিস অব রিয়েল লিটারারি জেম’!