Home / বই আলাপ / ‘জীবনযাপনের শিল্পকলা’ পড়েই বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিই-আমীন আল রশীদ

‘জীবনযাপনের শিল্পকলা’ পড়েই বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিই-আমীন আল রশীদ

 

book8বইপড়া আর নিজের প্রিয় বই নিয়ে বলেছেন কবি সাংবাদিক আমীন আল রশীদ

 

বইনিউজ: প্রথম কোন বই পড়ে আপনি সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত হয়েছেন?
আমীন আল রশীদ: ‘কানসোনার মুখ’ নামে বরেণ্য সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনের একটি বই ছিল আমাদের বুকশেলফে।তখন পর‌্যন্ত মোনাজাতউদ্দিন সম্পর্কে কিছু জানি না। বইয়ের প্রচ্ছদে কয়েকজন মানুষের স্কেচ। দেখে ঠিক বোঝা যায় না এটি উপন্যাস, গল্পগ্রন্থ নাকি প্রবন্ধের সঙ্কলন। তখন সম্ভবত অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। টুকটাক লেখালেখি করি। লিটল ম্যাগাজিন বানাই। তো ওই বইটির একটি গল্প পড়লাম। পড়েই একটা ধাক্কা খেলাম। মনে হলো, এটি তো ঠিক গল্প নয়, উপন্যাসও নয়। তাহলে জিনিসটা কী? অন্য গল্পগুলো পড়ে বুঝলাম এগুলো গল্প।‍ তবে মানুষের জীবনের গল্প। সত্য ঘটনা। এগুলো সংবাদ। যা গল্প আকারে লিখেছেন মোনাজাতউদ্দিন। সাংবাদিকতাও যে কী রকম উচ্চমার্গের সাহিত্য হতে পারে, তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ এই বই।

বইনিউজ: কোনো বই পড়ার পর সেই বইয়ের কোন চরিত্রের মতো হওয়ার বা তাকে অনুসরণ করার কী কখনো চেষ্টা করছেন? করে থাকলে পাঠকদের উদ্দ্যেশ্যে বিস্তারিত বলুন?

আমীন আল রশীদ: মোনাজাতউদ্দিনের কানসোনার মুখ পড়ার পরেই স্থির সিদ্ধান্ত নিই, সাংবাদিক হব এবং মোনাজাতউদ্দিনের মতো এরকম জনমানুষের সাংবাদিক হব। এই সিদ্ধান্ত থেকে আর সরিনি। স্থানীয় একটি সংবাদপত্রে লেখালেখি শুরু করি। তারপর সাংবাদিক হওয়ার লম্বা ইতিহাস। সেই ইতিহাস নির্মাণের মূল অনুঘটক ‘কানসোনার মুখ’। এই ঘটনার অনেক বছর পরে সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনের নামে প্রদত্ত ‘চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন স্মৃতি পুরস্কার’ পাই ২০০৫ সালে।এর তিন বছর পরে ২০০৮ সালে লিখি প্রথম বই ‘মানুষের গল্প’, যেখানে মোনাজাতউদ্দিনের লেখালেখির অনেক ছাপ রয়েছে বলে আমার ধারণা।তবে মোনাজাতউদ্দিনের মতো হতে চাইলেও তা শেষমেষ হতে পারিনি।কোনোদিন সেটি আর সম্ভব নয়।

বইনিউজ: আপনার পঠিত বাংলা সাহিত্যের সেরা একটি উপন্যাস পড়ার মজার স্মৃতি পাঠকদের সাথে শেয়ার করুন।
আমীন আল রশীদ: বিবিসির সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান।লেখেন মিজানুর খান নামে। লন্ডনে থাকেন।প্রেম, যৌনতা, মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধ নিয়ে তিনি ‘সোনার পরমতলা’ নামে যে উপন্যাসটি লিখেছেন, সেটিকে আমার এ যাবত পড়া সেরা উপন্যাস মনে হয়। শহীদুল জহিরের ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক অসাধারণ উপন্যাস। কিন্তু তারপরও সোনার পরমতলাকে কেন জানি সেরাতম মনে হয়। বলার ভঙ্গি,ঘটনার সঙ্গে নিজের মিশে যাওয়া, সাসপেন্স সব মিলিয়ে এটি একটি সম্পূর্ণ উপন্যাস।মনে আছে বইটি পড়তে শুরু করার পর এতটাই আবেগাক্রান্ত হয়ে গিয়েছিলাম যে,৩২০ পৃষ্ঠার বইটি আমাকে টানা পড়ে শেষ করতে হয়েছে। এর জন্য একদিন অফিসও কামাই দিতে হয়েছে। এত দ্রুত কোনো বই পড়ে আমি শেষ করতে পারিনি বা প্রয়োজন হয়নি।

book-7

বইনিউজ: আপনার জীবনযাপন, চিন্তাধারা ইত্যাদি বদলে দেয়ার ক্ষেত্রে কোন বইয়ের অবদান রয়েছে কী? থাকলে সে ব্যাপারে আমাদের পাঠকদের বিস্তারিত জানান?

আমীন আল রশীদ: আমার এ যাবত পড়া সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বই মনে হয়েছে ফরাসী লেখক আঁদ্রে মরোয়ার ‘জীবনযাপনের শিল্পকলা’। বইটির বাংলা তরজমা করেছেন কবীর চৌধুরী। অত্যন্ত সাবলীল এবং সুপাঠ্য অনুবাদ। পড়লে ঠিক অনুবাদ মনে হয় না।বলতে দ্বিধা নেই, এই বইটি পড়ার পরেই আমি বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিই।একটা সময় পর‌্যন্ত বিয়ে করার ব্যাপারে আমার খুবই অনাগ্রহ ছিল এবং এই কাজটিকে অত্যন্ত অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হত। হঠাৎ করেই আমার হাতে আসে ‘জীবনযাপনের শিল্পকলা’। বইটিতে কয়েকটি অধ্যায় রয়েছে যেমন, ভালোবাসার শিল্পকলা, চিন্তা করার শিল্প, বৃদ্ধ হবার শিল্পকলা ইত্যাদি। সেখানে একটি অধ্যায় আছে বিবাহের শিল্পকলা। বেশ আগ্রহ নিয়ে এ অধ্যায়টি পড়লাম এবং পড়ার পরে মনে হলো, বিয়েটা প্রয়োজনীয়।

চিন্তা করার শিল্পকলা অধ্যায়টি পড়লেও যে কারো চিন্তার জগৎ বদলে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। এই বইয়ের প্রতিটি অধ্যায় প্রয়োজনীয়। কীভাবে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে নেতৃত্ব দিতে হয় এমনকি কীভাবে বৃদ্ধ হতে হয়- তার সবই খুব পরিস্কারভাবে বলা আছে এই বইয়ে। প্রত্যেকের বুকশেলফে রাখার জন্য এটি একটি অত্যাবশ্যক বই বলে মনে হয়। আমি এ যাবৎ বইটির অন্তত ২০টি কপি কিনেছি উপহার হিসেবে দেয়ার জন্য।

বইনিউজ: সম্প্রতি পড়েছেন এমন একটি ভালো বই সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা আমাদের পাঠকদের জানান?

আমীন আল রশীদ: স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, এখন পড়ার পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। কাজের চাপ,দ্বিতীয়ত ইন্টারনটেরে প্যারা-সব মিলিয়ে ছাপার বই পড়া হয় খুবই কম। প্রয়োজনের তাগিদে যেসব পড়তে হয়, সেগুলো মূলত ইন্টারনেটকেন্দ্রিক। তারপরও এবারের বইমেলায় কেনা আকবর আলি খানের ‘অন্ধকারের উৎস হতে’ বইটি খুবই ভালো লেগেছে। এর একটি অধ্যায়ে তিনি জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন কবিতার যে ব্যবচ্ছেদ করেছেন, সেটি খুবই ইন্টারেস্টিং। জীবনানন্দের কবিতা নিয়ে অনেক দিন ধরে কাজ করলেও,বনলতা সেনকে নিয়ে এভাবে কখনো ভাবিনি বা এরকম ভাবনা এর আগে কোনো লেখায় পড়িনি।