Home / বই আলাপ / ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমরা বই বই করি

ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমরা বই বই করি

                                                                  Mizanur-Rahman-Khanমিজানুর রহমান খান

মিজানুর রহমান খান । পেশায় সাংবাদিক-কথাশিল্পী। বর্তমানে কাজ করছেন বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের বাংলা বিভাগের সাংবাদিক হিসেবে। এবারের বইমেলা, লেখক, লেখনীসহ সমসাময়িক নানান ইস্যু নিয়ে তার সাথে কথা হয় বইনিউজের।

বইনিউজ : আপনার লেখালেখির শুরুটা কখন থেকে?
মিজানুর রহমান খান : সেই স্কুল থেকে। স্কুল ম্যাগাজিনে প্রথম লেখা। সম্ভবত ক্লাস সিক্সে কিংবা ফাইভে পড়ি। আমি শাহীন স্কুলের ছাত্র ছিলাম। স্কুলের বন্দনা করে একটা কবিতা। অবশ্য ওটা ঠিক কবিতা ছিলো, নাকি ছড়া ছিলো আমি আজও সেটা বুঝতে পারি না। আমার ধারণা বেশিরভাগই মানুষই প্রথমে কবিতা বা ছড়া দিয়ে শুরু করে। প্রথমে ছড়া লিখে তারপর কবিতা। পরে যখন দেখে যে না ঠিক হচ্ছে না তখন ওসব ছেড়ে দিয়ে গল্প লেখা শুরু করে, তারপর একটু সাহস বাড়লে উপন্যাস ধরে। আমারও তাই হয়েছে। আমার লেখালেখির আরেকটা কারণ ছিলো চিঠি চালাচালি। তখনকার আমলে আমরা পত্রমিত্রালী করতাম। আমার অনেক পত্রবন্ধু ছিলো। প্রতিদিন একাধিক চিঠি আসতো আমার নামে। রাজশাহী, চট্টগ্রাম সিলেট- দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। খামের ওপর শুধু আমার নাম আর থানার নাম লেখা থাকতো। তারপরেও সেই চিঠি ঠিকঠাক আমার কাছে পৌঁছে যেতো। তখন আমি লিখতাম মনটি রহমান নামে। আমার কাছে এতো চিঠি আসতো যে ডাকপিওন আমার ওপর বিরক্ত হয়ে যেতেন। সেই সুযোগে তিনি আমার মায়ের কাছ থেকে টু্পাইসও কামিয়ে নিতেন। আমিও ওসব চিঠির জবাব দিতাম। আরেকটা জিনিসের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হয়। সেটা হলো পাড়ার ক্লাবের দেয়াল পত্রিকা। ওখানেও লিখতাম। তারপর দৈনিক পত্রিকাগুলোতে ছোটদের যেসব পাতা আছে ওখানে লেখা পাঠাতে শুরু করলাম। প্রথমে ছড়া, তারপর কবিতা মানে কিশোর কবিতা, তারপর গল্প। একবার একটা নাটকও ছাপা হয়েছিলো। একেকদিন একেক পত্রিকায় ছোটদের পাতা প্রকাশিত হতো। আমি তখন একটা টিউশনি করতাম। পড়তাম ক্লাস সেভেনে। পড়াতাম ক্লাস ফোরের এক ছাত্রকে। ওই টিউশনি করে সামান্য কিছু অর্থ রোজগার করতাম তার সবটাই ওইসব পত্রিকা কিনতেই খরচ হয়ে যেতো।

বইনিউজ : প্রথম বই কবে প্রকাশিত হয়?
মিজানুর রহমান খান: সালটা মনে করতে পারছি না। সম্ভবত ৯১/ ৯২ সাল হবে। একাত্তরের কয়েকজন শহীদের পরিবারের জীবন যুদ্ধের ওপর লেখা বই। আমি তখন সাপ্তাহিক বিচিত্রায় সাংবাদিকতা করি। পাশাপাশি ইউনিভার্সিটিতে পড়ি। শাহরিয়ার কবির ছিলেন বিচিত্রার নির্বাহী সম্পাদক। তিনি বইটি সম্পাদনা করেছিলেন। নাম ‘একাত্তরের অবিরাম রক্তক্ষরণ’। ওনার প্রজেক্ট ছিলো ওটা। এই বইটার পেছনে একটা গল্প আছে। এটা বের হওয়ার কথা ইংরেজিতে। আমেরিকার নিউ ইয়র্কে একটা প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হবে। তাই প্রথমে বাংলায় লিখলাম। আমিতো তখন আর ওরকম ইংরেজি লিখতে পারি না। তারপর এই বইটা ইংরেজিতে অনুবাদ হয়ে বের হলো- ‘টুয়েন্টি ইয়ার্স আফটার জেনোসইড ইন বাংলাদেশ’। আমার প্রথম বই। ডাকে একটা কপি হাতে আসলো আমেরিকা থেকে। বুক কাঁপছে। হাত কাঁপছে। বইয়ের মলাট উল্টে দেখি খুব সুন্দর ঝকঝকে সাদা কাগজ। দুধের মতো শাদা। ঢাকায় আমি তখন ওরকম ফর্সা আর মসৃণ কাগজ দেখিনি। তারপর খুঁজতে লাগলাম আমার নাম। কিন্তু মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো। দেখি আমার নামের সাথে অভিনেত্রী শমী কায়সারের নামও লেখা। আমার লেখা বাংলা বইটা হুবহু অনুবাদ করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে কিভাবে আরেকজনের নাম জুড়ে দেওয়া হলো সেটা আমি আজও বুঝতে পারিনি। তারপরেও আরেকটা বই বেরিয়েছে। সেটা ছিলো সমাজ নিরীক্ষাধর্মী। বইটির নাম ‘ফতোয়াবাজ’। বিচিত্রায় প্রকাশিত একটি প্রচ্ছদ প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ওই বই। ওই স্টোরির জন্যে আমাকে দেওয়া হয়েছিলো ‘নূরজাহান স্মৃতি পুরস্কার’। ওই বইটা বের করতে পারার পেছনে অবশ্য আমার কোনো ভূমিকা ছিলো না। শিশু সাহিত্যিক ছড়াকার আমীরুল ইসলাম অনেকটা জোর করেই বইটা প্রকাশের আয়োজন করেছিলেন। তবে আমি নিজে মনে করি আমার প্রথম বই হচ্ছে – ‘সোনার পরমতলা’। উপন্যাস। মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধ, যৌনতা আর প্রেমের এক কাহিনি। এই বইটির জন্যে আমি কালি ও কলম সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিলাম। এই সন্তানটিই এখন আমার সবচে প্রিয়। তবে আমার এই সন্তানেরও এখন বয়স হয়ে যাচ্ছে। সন্তান বড় হলে ধীরে ধীরে সে যেমন বাবা মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে থাকে তেমনি এই বইটার সাথেও আমার একটা দূরত্ব সৃষ্টি হতে শুরু করেছে। হয়তো নিজের মনের ভেতরেই, নিজের অজান্তেই, নতুন আরেক সন্তানের জন্যে মায়া মমতা তৈরি হচ্ছে।

বইনিউজ : প্রথম বই প্রকাশের কোন মজার ঘটনা পাঠকের সাথে শেয়ার করতে চান?
মিজানুর রহমান খান:  সোনার পরমতলা বইয়ের কথাই বলি। এই উপন্যাসটা লিখতে আমার কয়েক বছর লেগেছে। শুরু করেছিলাম জার্মানিতে। শেষ করেছি ব্রিটেনে। মাঝখানে দু’বছর ঢাকায় ছিলাম। তখন দুটো লাইনও লিখিনি। লেখা যখন শেষ হলো তখনতো প্রকাশ করতে হবে। কিন্তু সেটা কে করবে, কিভাবে করবো। বহু প্রকাশককে আমি চিনি। কিন্তু তাদের কাছে নিজের বইয়ের কথা বলতে লজ্জা হচ্ছিলো। তো পরিচিতি কয়েকজন বন্ধু বান্ধবকে বললাম। এখন সমস্যা হলো আমি পরিচিতি লেখক নই, আমার নাম কেউ জানে না। তারা প্রকাশকদের সাথে আলোচনা করলো। বুঝলাম একটা সমস্যা আছে। বড় সমস্যা। সমস্যাটা হলো আমি বিদেশে থাকি। এখন বাংলাদেশের প্রকাশকরা তাদের কাছে প্রথমেই জানতে চাইলো আমি কতো টাকা দিবো। এটা নাকি সবাই জানে যে প্রবাসী লেখকরা নাকি টাকা দিয়ে বই ছাপে। আমি বললাম, ভাই আমি কোনো লেখক না, একটা উপন্যাস লেখার চেষ্টা করেছি, হয়েছে কীনা জানি না। আর প্রবাসী আমি ঠিকই কিন্তু আমি প্রবাসী লেখক না। প্রয়োজন হলে আমি উপন্যাসটা নিজের কাছেই রেখে দেবো, নিজেই পড়বো কিন্তু এটা বই আকারে বের করার জন্যে আমি একটা পয়সাও দিতে পারবো না। ঢাকায় নামকরা এক প্রকাশকের সঙ্গে আলাপ হলো। তিনি আগ্রহ দেখালেন। পাণ্ডুলিপি পাঠাতে বললেন । ইমেইল করে পাঠালাম। তিনি বললেন, গল্পটা তার ভালো লেগেছে, ছাপাবেন। দাওয়াত করলেন বাংলাবাজার অফিসে যেতে। ঢাকায় ট্রাফিক জ্যাম ঠেঙিয়ে ওনার অফিসে গেলাম। তিনি তখন অনেক ব্যস্ত। সরকারি দলের নেতাদের বই ছাপাবেন। এক মন্ত্রীর বই নিয়ে তাকে ফোন করে জ্বি জ্বি করতে দেখে ওনার জন্যে খুব কষ্ট হচ্ছিলো। তারপর যখন কথা শুরু হলো বুঝলাম ওনার মনের মধ্যে ওঁৎ পেতে আছে পাউন্ড। উনি উপন্যাসের নাম বদলানোর পরামর্শ দিলেন। বললেন, এই নাম পাবলিক খাবে না। আমি আর কিছু বলিনি। উঠে চলে এলাম। পুরো দিনটাই নষ্ট হলো। সাথে ছিলো আমার এক বন্ধু। দেখলাম তার মনটাও খুব ভার। আরেকজন লেখক কাম প্রকাশককে আমি খুব ঘনিষ্ঠভাবে চিনতাম। বহুদিনের পরিচিত। খুব কাছের মানুষ। তিনি আগ্রহ দেখালেন। পাণ্ডুলিপি চাইলেন। কয়েকদিন পর বললেন ভালো লিখেছো। তারপর দেখি একদিন তিনি মেসেজ পাঠিয়েছেন। ওনার প্রকাশনা সংস্থার নাকি অবস্থা খুব বেশি ভালো না। ওনাকে দু’লাখ টাকা ধার দিতে পারবো কীনা। আমি সোজা বলে দিলাম, না ভাই, আমার কাছে কোনো টাকা নেই। আমার আর্থিক অবস্থা বর্ণনা করে খুব বিনয়ের সাথে লিখলাম, আশা করি আপনাকে আমি বোঝাতে পেরেছি। উনি শুধু লিখলেন হুম, পেরেছো। কিন্তু তারপর থেকে উনি আমার সাথে যোগাযোগই বন্ধ করে দিয়েছেন। তারপর গেলাম বিখ্যাত এক প্রকাশনা সংস্থার সাথে। বড় একটি দৈনিক পত্রিকার সাইড ব্যবসা এই সংস্থাটি। যিনি ওই ব্যবসা দেখাশোনা করেন তিনি মুখের ওপর সত্য কথাটা বলে দিলেন। বললেন, ভাই আমরা নিজেদের ঘরের লেখকদের বাইরে বই ছাপি না।  আমি বললাম, ছাপতে হবে না। শুধু একবার পড়েন। তিনি বললেন, আপনার বই যদি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মতো ভালো হয়, তারপরেও আমরা ছাপতে পারবো না। প্রকাশক খোঁজার এই গল্পটা ওখানেই শেষ হতে পারতো। কিন্তু আমার এক সাংবাদিক বন্ধু তখন আমাকে উদ্ধার করতে এগিয়ে এলো। সে বললো খুব তরুণ একজন প্রকাশক আছে, ওর বন্ধু, নাঈম। কথা বলে দেখতে পারেন। তারপর ঐতিহ্য প্রকাশনীর ওই আরিফুর রহমান নাঈমের সাথে আমার মাত্র কয়েকবার কথা হয়েছে, তাও টেলিফোনে। ফেব্রুয়ারি মাস বলে খুব ব্যস্ত ছিলো সে। পরে যখন ঢাকায় গেলাম নাঈম আমাকে দুপুরের খাবারের দাওয়াত দিলেন। লাঞ্চ করতে বসে টেবিলে ওপর দেখি রুই মাছ, মাংসের আর নানা রকমের সব্জির তরকারি, পাশে ছিলো আমার বইটাও।

বইনিউজ : আসছে একুশের বইমেলায় আপনার কী কোন নতুন বই প্রকাশিত হচ্ছে?
মিজানুর রহমান খান:  না। সোনার পরমতলার পর আমি একটা লাইনও লিখিনি। অনেক পরিকল্পনা ছিলো। কিন্তু লেখা হয়নি। প্রথমত ব্যস্ত জীবন। বিদেশের জীবনে লেখার জন্যে সময় বের করা খুব কঠিন। আমার অবশ্য আরেকটা দোষ আছে। আমি সবসময় ভাবি ভালো কিছু লিখবো। কিন্তু আমার মনে হয় একজন লেখকের কখনোই এটা ভাবা উচিত নয়। তার উচিত শুধু লেখা। ভালো কিছু লেখার জন্যে বসে থাকলে কখনোই লেখা হবে না। আশা করছি, আগামী অন্তত দু’বছরের মধ্যে একটা লিখে ফেলতে পারবো। লিখতে আমাকে হবেই। প্রতিদিন ভাবি আমি লিখবো কিন্তু কোনোদিনই লেখা হয় না। আমি আসলে ভেতরে ভেতরে খুবই অলস একটা মানুষ। মহা অলস টাইপের।

বইনিউজ : সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে নন-ফিকশন বইয়ের সংখ্যা এবং লেখক কমে যাচ্ছে, তার মানে কী পাঠক নন-ফিকশন পড়তে আগ্রহী নয়?
মিজানুর রহমান খান:  ফিকশন – নন-ফিকশন বাদ দিন। বাংলাদেশে বই পড়ে ক’জন আগে সেটা বলুন। ১৬ কোটি মানুষের দেশ। কতো বই বিক্রি হওয়ার কথা! কিন্তু বারোশ বইওতো বিক্রি হয় না। প্রকাশক হা-হুতাশা করেন। ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমরা বই বই করি। সেটাও লোক দেখানো। আমি এমন লোকজনকেও চিনি যারা আমার বই কিনেছেন, সুন্দর করে সিটিং রুমের শেলফে সাজিয়েও রেখেছেন, আমার ওই বাসায় বেড়াতে গেলে আমাকে দেখিয়ে খুব সুন্দর করে আমাকে খুব ভালোবাসে টাইপেরও হাসিও দেয়, কিন্তু আমি জানি যে সে বইয়ের একটা পাতাও পড়েনি। সত্যি কথা বলতে, আমিতো বাংলাদেশে কোনো মানুষের হাতে রাস্তায় চলতে ফিরতে কখনো বই দেখি না। আমি লন্ডনে থাকি। ওখানে যদি দেখেন কেউ বাস বা ট্রেন স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে বা পাতাল রেলে করে কোথাও যাচ্ছে তাহলে দেখবেন তার হাতে একটা বই। নিমগ্ন হয়ে বই পড়ছে। মানুষের সাথে যে হাত ব্যাগ থাকে তাতে একটা বই থাকেবই।
এখন ফিকশন আর নন-ফিকশনের কথা যেটা বললেন সেটার জবাব হচ্ছে ফিকশন লেখা সহজ। আবার পড়াও সহজ। শুধু বইয়ের বেলায় নয়। সবকিছুতেই। বাংলাদেশে টেলিভিশনে দেখবেন শুধু নাটক, নাটক আর নাটক। ডকুমেন্টারি ধরনের কিছু কি দেখেন কখনো? সেজন্যে দেখবেন প্রচুর কবিতার বই। তারপর গল্প উপন্যাস। নন-ফিকশন লিখতে হলেতো আপনাকে ঘাটাঘাটি করতে কবে, গবেষণা করতে হবে, খাটতে হবে, সময় দিতে হবে। সুতরাং এই নন-ফিকশন আপনি কোথায় পাবেন। আর নন-ফিকশন বইয়ের কথা যদি বলেন তাহলে বলুন এই বইগুলো কিরকম বই। পত্রিকার পাতায় দৈনন্দিন রাজনীতি নিয়ে কলাম লিখতেন। সেগুলো দুই মলাটের ভেতরে ভরে দিয়ে বই লেখক হয়ে গেলেন। সেজন্যেই এই অবস্থা। কিন্তু আপনি যদি ভালো বই দিতে পারেন, সেটা ফিকশন কি নন-ফিকশন, যাই হোক না কেনো, পাঠকদের আকৃষ্ট না করার কোনো কারণ নেই।

বইনিউজ : আপনি কী মনে করেন এই সময়ে তরুণদের মধ্যে চিন্তার জাগরণ ঘটায় এমন বইয়ের প্রতি আগ্রহ নেই?
মিজানুর রহমান খান:  প্রশ্নটা পরিষ্কার নয়। চিন্তার জাগরণের কথা বলছেন। আবার বলছেন আগ্রহ নেই। জাগরণ ঘটলেতো আগ্রহ বাড়ার কথা ছিলো। তাহলে কি কোথাও ভুল হচ্ছে? আমার মনে হয় না যে চিন্তার ক্ষেত্রে বড় রকমের কোনো জাগরণ হয়েছে। হ্যাঁ নতুন প্রজন্ম সব সময় অগ্রসর থাকে, তাদের মধ্যেও একটা জাগরণ হয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয় বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে সেটা হয়েছে উপরে উপরে। গভীর চিন্তা করার সময় এখন নেই। জীবন অনেক ব্যস্ত। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়া আর স্ট্যাটাস পড়া পর্যন্তই এই চিন্তার দৌড়। এসব নিয়ে কেউ ভাবে বলেও মনে হয় না। তরুণরাতো বটেই, প্রবীণরাও ভাবেন না, লেখকরা ভাবেন না, প্রকাশকরা ভাবেন না, বুদ্ধিজীবী যাদেরকে বলি তারাও ভাবেন না, রাজনীতিক আর নীতি নির্ধারকদের কথা তো বাদই দিলাম। চিন্তার এই দৈন্য দশা সর্বত্রই। এর নিদারুণ ফল হয়তো আরো কয়েক বছর পর দেখতে পাবেন।

বইনিউজ : মুক্তচিন্তায় একের পর এক লেখক-প্রকাশক হত্যা হচ্ছে, আপনি কী মনে করেন এর মধ্য দিয়ে মুক্তচিন্তার পথ রুদ্ধ করা হচ্ছে?
মিজানুর রহমান খান:  ‘মুক্তচিন্তা’ শব্দটি নিয়েই আমার আপত্তি আছে। মুক্তচিন্তা বলে কিছু নেই। সব চিন্তাই মুক্ত। মুক্ত না হলে সেটাকে চিন্তা বলা যাবে না। চিন্তা চিন্তাই। আমি মনে করি এই শব্দটার মধ্যে একটা রাজনীতি আছে। পক্ষপাত আছে। দেখুন, একটি গোষ্ঠী যখন আরেকটা গোষ্ঠীকে সমালোচনা করে তখন সেটাকে কখনো সাম্প্রদায়িক বলা হয়। আবার এই গোষ্ঠীটাই যখন অন্য গোষ্ঠীকে আক্রমণ করে তখন সেটাকে বলা হয় মুক্তচিন্তা।
আপনি হয়তো ব্লগার হত্যাকাণ্ডের কথা বলছেন। আমার মনে হয় এর কিছুটা প্রভাব পড়বে, সাময়িকভাবে হলেও। অস্বীকার করার উপায় নেই, একের পর এক এসব হত্যার পর লেখক ও প্রকাশকরা লেখা ও বই প্রকাশ করার আগে তারা অন্তত একবার হলেও চিন্তা করে দেখবেন যে এই বিষয়ে তারা বই লিখবেন কী না। ফলে ব্যতিক্রমী বই এখন হয়তো একটু কম দেখা যেতে পারে। তবে আমার বিশ্বাস এই ভীতিটা খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কারণ কিছু মানুষকে আপনি সবসময় ভয় দেখিয়ে রাখতে পারেন, সবাইকে কিছু সময়ের জন্য ভয় দেখাতে পারেন, কিন্তু সবাইকে তো আর সবসময়ের জন্যে ভয় দেখিয়ে রাখতে পারবেন না।

বইনিউজ : গত বইমেলায় লেখক অভিজিৎ রায়কে হত্যা করা হয়েছে এরপর সম্প্রতি একজন প্রকাশককে হত্যা করা হয়েছে এবং আরো তিনজন লেখক-প্রকাশকের উপর হামলা হয়েছে। আগামী একুশের বইমেলায় এর কোন প্রভাব পড়বে কী?
মিজানুর রহমান খান:  যদি মেলার কথা বলেন তাহলে আমি বলবো কোনো প্রভাব পড়বে না। দেখবেন গতবারের তুলনায় এবার মেলায় আরো বেশি মানুষ আসবে। আরো বেশি বই বিক্রি হবে। মানুষজন হয়তো একটু আতঙ্কিত হয়ে থাকবে, কিছুটা অস্বস্তি বোধ করবে, কিন্তু মানুষের অভাব হবে না। মানুষের এই ঢলের সাথে অবশ্য মেলার গুণগত মানের কোনো সম্পর্ক নেই। এদের কতো শতাংশ বই কেনেন, তাদের কতো ভাগ বই পড়েন আমার সন্দেহ আছে। তবে আমি মনে করি, মেলায় যতো মানুষ আসবে ততো ভালো। একশোজন মানুষ আসলে যদি একটা বই বিক্রি হয়, এক হাজার মানুষ এলে বই বিক্রি হবে দশটা।
তবে ওই যে বলছিলাম, কি ধরনের বই প্রকাশিত হবে, লেখকরা কি নিয়ে লিখবেন তার ওপর হয়তো এসব হত্যাকাণ্ডের প্রভাব পড়তে পারে। তবে এই প্রভাবটাও হবে সাময়িক।

বইনিউজ : বাংলা একাডেমি আয়োজিত একুশের বইমেলা নিয়ে লেখক হিসেবে আপনার কোন পরামর্শ আছে কী?
মিজানুর রহমান খান:  না, কোনো পরামর্শ নেই। এটা আমার কাজও না। আয়োজকরা সবই জানেন। তারপরেও আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি এই মেলাকে ঘিরে কর্তৃপক্ষের এমন কিছু করার উচিত যাতে লোকজন বই পড়তে আরো বেশি আগ্রহী হয়। শুধু কিছু দোকানদারকে দিয়ে বই বিক্রি করতে দেয়ার মধ্যে বাংলা একাডেমির কৃতিত্ব বা সাফল্য দাবি করার কিছু নেই। বাংলা একাডেমির কাজ হবে আরো বৃহৎ। আমি মনে করি, বাংলা একাডেমিকে এই মেলাকে ঘিরে এমন কিছু করতে হবে যাতে বই মানুষের মনে আনন্দ বেদনা দুঃখ কষ্ট, ক্ষোভ প্রতিবাদ ভালোবাসা ঘৃণা এসব অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারে। বই যাতে আমাদেরকে মানুষ করে তুলতে পারে। কারণ সবকিছুর পরে এটাই মেলার উদ্দেশ্য।